অকাল মৃত্যুতে দীর্ঘ হচ্ছে প্রবাসীদের মৃত্যুর মিছিল!

নাওশাদ আনাচ শান্ত, সৌদি আরব থেকে :

প্রবাসে এসে স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই শামিল হচ্ছেন মৃত্যুর মিছিলে।

আর্থিক অনটন আর ভাগ্য বদলাতে এসে পারিবারিক চাপে মালিকপক্ষের বিড়ম্বনার শিকার হয়ে অনেক প্রবাসী যোগ দিচ্ছে অকাল মৃত্যুর মিছিলে। আর এই আকস্মিক মৃত্যুর মিছিল দিন দিন বেড়েই চলছে ।

পরিসংখ্যান বলছে,২০১৮ সালে প্রবাসী মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ,ধারনা মতে ২০১৯ এ সংখ্যাও ছাড়িয়ে যাবে। যদিও এটি দেশে ফেরত আসা বৈধ শ্রমিকের মরদেহের হিসাবমাত্র।

বেসরকারি ভাবে প্রবাসে প্রবাসীদের মৃত্যু সংখ্যা সরকারি হিসাবের চাইতে বেশি ।বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক ও হৃদরোগ। এদের অধিকাংশেরই বয়স ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে।

অভিবাসন ব্যয়ের তুলনায় কম আয়ের কারণে মানসিক চাপ ও দীর্ঘদিন স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে একাকিত্বই প্রবাসী শ্রমিকদের স্ট্রোক ও হৃদরোগের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

পাশাপাশি দৈনিক ১২-১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম, অপর্যাপ্ত খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকার কারণেও রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা।

তাই মানসিক চাপ কমাতে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা তৈরি করার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।প্রবাসীরা বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকায় তাদের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্তের হার বেশি।

এছাড়া দেশের বাইরে যাওয়ার পর তাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসে, যা হৃদরোগের জন্য দায়ী। আবার অনেকে জানেন না, কোথায় কীভাবে চিকিৎসা নিতে হয়। কোনো ধরনের চেকআপের মধ্যে না থাকায় অনেকে হৃদরোগে ভুগলেও চিকিৎসা না করায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

দীর্ঘদিন সৌদিতে আবাসিক হোটেলে শ্রমিক হিসাবে কর্মরত ফেনী জেলার মানিক প্রতিবেদককে বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিবাসী কর্মীরা ঋণ নিয়ে বিদেশে যায়। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর যে বেতনের কথা তাদের বলা হয়, সেগুলা তারা পায় না। তাদের ঘাড়ে ঋণের একটা বোঝা থেকে যায়।

এক্ষেত্রে যেটা হয় অনেকেই এই চাপ নিতে পারে না। এতে তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা কাজ করে, ফলে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়।তাই এক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে শ্রমিকদের বেতন কর্মপরিবেশে এবং রোগে আক্রান্ত হলে কর্মক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা।

আমি এ-ও মনে করি, অভিবাসনের যে খরচ সেটা না থাকলে তাদের মধ্যে এই টেনশন কাজ করবে না।খরচ তুলে আনার বিষয়ে যে অস্থিরতা তাদের মধ্যে কাজ করে এটা আর থাকবে না।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের তথ্য মতে ২০১৮ সালে মোট ৩ হাজার ৭৯৩ বাংলাদেশী কর্মীর মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৮৭।আর ২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত বৈধ কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে ১৯২২ জনের। অধিকাংশ প্রবাসীর ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্ট্রোক ও হৃদরোগ।

বেশির ভাগ মরদেহই এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে সৌদি আরব থেকে। সৌদি আরবের পর বেশি মরদেহ এসেছে মালয়েশিয়া থেকে।

সুস্থ দেহে দেশ থেকে যাওয়ার পরও প্রবাসী শ্রমিকদের স্ট্রোক ও হৃদরোগে মৃত্যু কেন বাড়ছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করেন প্রবাসে কর্মরত মানবাধিকার কর্মী জুয়েল পাটোয়ারী।

তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে পাড়ি দেয়ার আগে মেডিকেল চেকআপ করে যাচ্ছেন। সে সময় কিন্তু হৃদরোগ ধরা পড়ছে না। বিদেশে পৌঁছার পরও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এ ধরনের কোনো উপসর্গ পাওয়া যাচ্ছে না। এর পরও প্রবাসী শ্রমিকদের অস্বাভাবিক মৃত্যু কেন বাড়ছে, সরকারিভাবে সেটা খতিয়ে দেখা উচিত।

আপনার মন্তব্য দিন