আত্মসমর্পনের পূর্বে ইয়াবা কারবারীদের অবৈধ অর্থ-সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেয়ার দাবী

নিউজ কক্সবাজার রিপোর্ট :

কক্সবাজারের টেকনাফ সহ জেলা জুড়ে গত কয়েকদিন ধরেই গুঞ্জন চলছে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পনের কথা । এনিয়ে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম সহ সর্বত্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও মহলে ইয়াবা  কারবারীদের আত্মসমর্পনকে সাধুবাদ জানালেও দাবী উঠেছে আত্মসমর্পনের পূর্বে তাদের অবৈধ স্থাপবর অস্থাবর অর্থ-সম্পদ যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নেওয়া হয়।

তারা যুক্তি দিয়েছেন জলদস্যূদের যেমন আত্মসমর্পনের সময় জমা নেওয়া হয় আগ্নেয়াস্ত্র ঠিক তেমনি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অস্ত্র হচ্ছে তাদের অর্থ-সম্পদ। তাই তাদের বিপুল অর্থ সম্পদ আত্মসমর্পনের সময় যেন জমা নেওয়া হয়। তাহলেই এই আত্মসমর্পন প্রক্রিয়া যথাযত হবে বলে মনে করছেন তারা।

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স ঘোষনার পর গত মে মাস হতে দেশব্যাপী একযোগে মাদক বিরোধী সাঁড়াশী অভিযান শুরু করে আইনশৃংখলা বাহিনী। এতে সারাদেশে এ পর্যন্ত চারশর বেশী লোক মাদক ব্যবসায় সংশ্লিষ্টটার অভিযোগে আইন শৃংখলা বাহিনী অথবা নিজেদের মধ্যে বন্দুরযুদ্ধের ঘটনায় নিহত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ইয়াবার প্রবেশদ্বার হিসাবে খ্যাত টেকনাফেও শুধু হয় মাদক বিরোধী এ বিশেষ অভিযান। শুরুতে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এ অভিযানকে তেমন একটা পাত্তা না দিলেও পরবর্তীতে একের পর এক মাদক ব্যবসায়ীর গ্রেফতার ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটতে থাকলে নড়েচড়ে বসে সীমান্তের শীর্ষ ইয়াবা কারবারীরা। এরপর চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ীরা গা ঢাকা দিতে শুরু করে। খা খা করতে থাকে তাদের সুরম্য ইয়াবা প্রাসাদ গুলো। একপর্যায়ে গত অক্টোবর মাসে প্রদীপ কুমার দাস টেকনাফ থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেন। এরপর অভিযানের তীব্রতা বেড়ে যায় বহুগুনে। বাড়তে থাকে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা। টেকনাফে এপর্যন্ত আইনশৃংখলা বাহিনী ও নিজেদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ৩৫জনের বেশী মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। তারমধ্যে গত দুইমাসে ওসি প্রদীপের যোগদানের পর ২০ জনের বেশী নিহত মাদক ব্যবসায়ী নিহত হন। শুধু বন্দুকযুদ্ধই নয় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সুরম্য অট্টালিকা গুলোতে আঘাত হেনে তাদের দূর্বল করা হয়। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন তালিকাভুক্ত ও শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে।

অভিযানের তীব্রতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। একদিকে বন্দুকযুদ্ধে একের পর এক প্রানহানি, অপরদিকে সুরম্য ইয়াবা প্রাসাদগুলো ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে বুলডোজারের আঘাতে। এ থেকে বাঁচার উপায় খুঁজতে থাকে তারা। মহেশখালী দ্বীপের জলদস্যূদের মতো আত্মসমর্পনের মাধ্যমে রক্ষা পাওয়া যায় কিনা তা নিয়ে দফায় দফায় গোপন বৈঠক বসে শীর্ষ ইয়াবা গডফাদাররা।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় মিডিয়ার মাধ্যমে জনমত তৈরী করে সরকারের নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষন করা গেলে হয়তো আত্মসমর্পন করে অভিযান থেকে বেঁচে যেতে পারবে তারা। ইতিমধ্যে সেভাবেই প্রস্তুতি গ্রহন আত্মসমর্পনের তালিকা প্রস্তুত করে তারা। আর এর খরচ যোগাতে আত্মসমর্পনে ইচ্ছুক ইয়াবা কারবারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই এগুচ্ছিল। এরকম আত্মসমর্পনকে অনেকে সাধুবাদও জানিয়েছেন।

কিন্তু এর মাঝে সচেতন মহলে আত্মসমর্পন নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এনিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছে আবার অনেকে সরাসরি তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

টেকনাফ সরকারী কলেজের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আবু তাহের জানান, আত্মসমর্পন করে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা মূল স্রোতে ফিরে আসলে সাধুবাদ জানাই । তবে ইয়াবা সেবন করে দেশের যুবসমাজ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঠিক তেমনি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের রাতারাতি অর্জিত অবৈধ অর্থের কারনে সামাজিক ভারসাম্য-স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। তাই জলদসূদের অস্ত্র সমর্পনের মতো ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অর্থ সমর্পন অত্যন্ত জরুরী।

টেকনাফ সদর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সাধারন সম্পাদক গুরা মিয়া গত বুধবার তার ফেইসবুকে টাইমলাইনে লিখেছেন : জলদস্যূ আর ইয়াবা বিয়ারি এক না। টেকনাফে কিছু সংবাদ কর্মি ইদানিং ইয়াবা ব্যবসায়ীর পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করছে। যা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত মাদকের জিরু টলারেন্স নীতির সাথে অনেকটা সাংঘর্ষিক। তাদের যুক্তি হচ্ছে জলদস্যূরা যদি ক্ষমা পায় মাদক বিয়ারিরা কেন পাবে না? জলদস্যূরা দস্যূমি করে হয়তো গুটি কয়েক জন কে হত্যা করছে কিংবা কিছু টাকা পয়সা কেড়ে নিয়ে সংসার চালিয়েছে।

ইয়াবা ব্যবসায়ীরা সমাজ সহ পুরা জাতিকে ধ্বংস করেছে এবং দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে গেছে। অহরহ মানূষের ভূমি জবর দখল করেছে।অগনিত সাধারণ মানূষ কে অহেতুক হয়রানি করেছে। সমাজের সম্মানিত ব্যাক্তিদের কে অপমানিত করেছে। কথায় কথায় গুলি চালিয়েছে। এ সবের ক্ষতিপূরণ বহন করবে কে? তা ছাড়া ইতি পূর্বে যারা ক্রসফায়ারের স্বীকার হয়েছে তারাওতোত একই অপরাধে অপরাধী।

অনেকে আছে আবার মিথ্যা মামলার আসামি। তাদের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্তইবা আসতে পারে? সব মিলিয়ে একটা অজানা গল্প রচনা না করায় ভাল। হাজার ও সমস্যা হইতে পারে। মনে রাখতে হবে অপরাধ করলে ফল ভোগ করতে হবে, ইয়াবা ব্যবসায় অর্জিত অর্থ-সম্পদ দিয়ে ইতিমধ্যে অনেকে জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হয়েছে, রিক্সাঅলা-দিনমজুর কিংবা গাড়ির হেলপার হয়েছে রাতারাতি কোটিপতি।

সীমান্তের অলিগলিতে তৈরী করেছে সুরম্য অট্টালিকা। ফলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরী হয়েছে। বিনষ্ট হয়েছে সামাজির ভারসাম্য। আবার শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীরা মালয়েশিয়া-সিংগাপুর-দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করে সম্পদের মালিক হয়েছে। ইয়াবার কালো টাকা দিয়েই তারা দিনকে রাত আর রাত কে দিন করেছে। ফলে আত্মসমর্পন প্রশ্নে অর্জিত এই অবৈধ অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে সরকারের নীতি নির্ধারনী মহলে গুরুত্বের সাথে নিয়ে সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

দাবী উঠেছে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অবৈধ অর্থ সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিয়ে যেন তাদের আত্মসমর্পনের সুযোগ দেওয়া হয়। সচেতন মহলের মতে যদি ইয়াবা ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ-সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে আত্মসমর্পন করতে চায় তাহলে ধরে নিতে হবে আত্মপলদ্ধি থেকেই তারা অনুতপ্ত হয়ে আত্মসমর্পন করে নতুন জীবনে ফিরে যেতে চাচ্ছে। আর যদি তাদের সেই অবৈধ অর্থসম্পদ জমা দিতে রাজী না হয় তবে ধরে নিতে হবে মাদক বিরোধী সাঁড়াশী অভিযান হতে রক্ষা পেতেই তারা আত্মসমর্পনের নামে সাময়িক কৌশল গ্রহন করেছে মাত্র।

কেননা বলা হচ্ছে সাগরে দস্যূতা আর সীমান্তের পাচার করা ইয়াবা কারবারের অপরাধ এক নয়। জলদস্যূতা হয় দৃশ্যমান আর ইয়াবা কারবার হয় অদৃশ্যে। আত্মসমর্পনের পর পুরোনো কারবারে ফিরে যাবেনা এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেনা। কেবল শান্তনা এখানেই ওরা আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারীদের তালিকাভুক্ত হবে।

এব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক এবিএম মাসুদ হোসেন বলেছেন, ইয়াবা কারবারীদের আত্মসমর্পনের জন্য কঠোর শর্ত দেওয়া হবে। শর্তবিহীন আত্মসমর্পন করে অপরাধ হতে রেহাই পাবার কারো সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, যেসব ইয়াবা ডিলার ইতিমধ্যে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তাদের এ পদ্ধতিতে ফিরে যাবার কোন সুযোগ নেই।

আপনার মন্তব্য দিন