আন্তর্জাতিক হ্যাকার চক্রের সদস্য সিরাজের প্রতারক হয়ে ওঠার গল্প! 

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, নিউজ কক্সবাজার :

বাংলাদেশী এক প্রতারক, নাম তার সিরাজ। সৌদি আরবে অবস্থান করে গত কয়েক বছরে কোটিপতি হয়ে গেছে সে। দু’বছর আগে এই সিরাজ ওমরা ভিসা নিয়ে পা রাখেন স্বপ্নের দেশ সৌদি আরবে। ওমরার নামে সৌদি গিয়ে আর দেশে ফিরেনি। অবৈধভাবে সেখানে বসবাসের পাশাপাশি শুরু করেন নানান জালিয়াতি আর প্রতারণা। সঙ্গে নেন কয়েকজনকে। গড়ে তোলেন এক বিশাল প্রতারক চক্র।

অন্য দশজন ছেলের মত সিরাজের শৈশব কাটে পাড়াগায়ের মাঠি ও বাতাসে৷ একটু একটু বড় হতেই তার অস্বাভাবিক আচরণ পরিবারের চোখ এড়াতে পারেনি। এক সময় ইয়াবা এবং মানব পাচারে জড়িয়ে পড়ে প্রতারক সিরাজ৷ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধ্বংসকারী ইয়াবা ব্যবসা করে অল্প দিনে কোটি টাকার মালিক বনে যায় সিরাজ। সিরাজকে বলা হয় টেকনাফের স্বল্প বয়সী কোটিপতি। তার অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি আলাদিনের চেরাগের গল্পকেও হার মানায়৷ শিক্ষায় প্রাথমিকের গণ্ডি পার হতে না পারলেও সিরাজ ছোট কাল থেকে খুব চালাক প্রকৃতির এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে তার বিশেষ দক্ষতা ছিলো।

ছোটবেলা থেকেই আসতে আসতে জড়িয়ে পড়ে অনলাইন প্রতারণায়।  সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি, ইমু, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার হ্যাক করে তার দক্ষতার প্রমাণ দেয় এলাকায়৷ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেন অনেক নামিদামি ব্যক্তি ও সমাজ সচেতন মানুষকে। এনিয়ে গ্রামে বহুবার বিচার সালিশের মুখোমুখি হতে হয়েছিল প্রতারক সিরাজ এবং তার পরিবারকে৷ সে যাত্রায় মুচলেকা দিয়ে পার পেয়ে যান প্রতারক সিরাজ৷

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ইয়াবা ব্যবসা,  মানব পাচার এবং অনলাইন প্রতারণা একসময় তার নেশা এবং পেশায় পরিণত হয়।  শেষমেষ উপায় না দেখে এবং দেশব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণা  করলে অনেক মাদক ব্যবসায়ীর মতো এই প্রতারক সিরাজও আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। মাদক বিরোধী অভিযান শুরু হলে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবে পালিয়ে যান সিরাজ। হ্যাকার

সিরাজের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের কচুবনিয়া গ্রামের আবদু রশিদের ছেলে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

একাধিক সুত্র জানান, সৌদি আরবে যাওয়া নিয়েও প্রতারণার আশ্রয় নেই সিরাজ এবং সিরাজের পরিবার। ওমরার নামে সৌদি আরবে গমন করে, বাংলাদেশে  আর ফিরে আসেনি৷ সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করছেন এই প্রতারক সিরাজ।
সৌদি আরবে এক প্রকার লোকচক্ষুর আড়ালে বসবাস করে প্রতারক সিরাজ। সৌদি আরবে বসবাসরত প্রবাসীদের সাথে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে কেউ তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানাতে পারেনি৷ কেউ কেউ ধারণা করেন সৌদি আরবের জেদ্দার কোন এক পাহাড়ে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে প্রতারক সিরাজ।

সুত্র মতে, সৌদি আরবে বসে ব্ল্যাক মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে হেকিং সফ্টওয়ার কিনে শুরু করেন তার অনলাইন প্রতারণার ব্যবসা৷ প্রবাসীদের সাথে সুকৌশলে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত অনেক তথ্য হাতিয়ে নেয় যা পরবর্তীতে হ্যাকিংয়ের সময় ব্যবহার করে, এমন অভিযোগ করেছেন অনেক প্রবাসী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রতি এক সৌদি প্রবাসী জানান, কিছুদিন আগে তিনি বিয়ে করে সৌদি আরবে যান।

সেখানে সিরাজের সাথে তার পরিচয় হয়। একসময় পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগান প্রতারক সিরাজ। ফেসবুকে ফিশিং লিনক পাঠিয়ে সে লিনকে সিরাজ নিজেই ক্লিক করে হাতিয়ে নেন প্রবাসীর ফেসবুকের ইমেইল আইডি এবং পাসওয়ার্ড।  ফেসবুকের মেসেঞ্জার থেকে নব বধূর সাথে আদান-প্রদান হওয়া ব্যক্তিগত বিশেষ মুহূর্তের ছবি, ভিডিও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়ে নেয় এই প্রতারক সিরাজ।

এর পর থেকে প্রবাসীর জীবনে নেমে আসে কালো মেঘের ঘনঘটা। আসতে আসতে সিরাজের আসল চেহারা বের হতে শুরু করে। ব্ল্যাকমেইলিং, চাদা দাবি করা, মোটা অংকের টাকা না দিলে ইন্টারনেটে ছবি এবং ভিডিও ছেড়ে দিয়ে ভাইরাল করার হুমকি দেন। এক পর্যায়ে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ফেসবুক আইডি ছবি এবং ভিডিও ফেরত দেয়ার আশ্বাস দেন।

প্রবাসী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রতারক হ্যাকার সিরাজ তার ফেসবুকের প্রোফাইল ফটো এবং কভার ফটো নিয়ে ফেসবুকে আইডি খুলে প্রবাসীর পরিবার এবং বন্ধু বান্ধবদের মেসেঞ্জারে তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি পাঠিয়ে তাদেরকেও ভয় ভীতি এবং চাঁদা দাবি করে৷

শেষমেষ উপায় না দেখে ওই প্রবাসীর পরিবার টেকনাফ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন প্রতারক সিরাজের বিরুদ্ধে । যার নং-৯৭৬/১৯। এছাড়াও আরো একজন তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় সাধারণ করেছে। যার জিডি নং- ৯৭৫/১৯।  থানায় দায়েরকৃত ডায়েরির কপি স্ক্যান করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সাইবার অপরাধ দমন ইউনিট, র‍্যাব এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধ দমন সংশ্লিষ্ট অফিসে ইমেইল এবং পোস্ট অফিস যুগে পাঠিয়েছে বলে সুত্রটি এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন। প্রতারণার শিকার অনেক প্রবাসী ও সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তি এই প্রতারকের বিরুদ্ধে জিডি ও মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। সিরাজের সাথে প্রবাসীর ইমুতে টাকা লেনদেন,ভয়-ভীতী, হুমকি দেওয়ার অসংখ্য স্ক্রিনশট এই প্রতিবেদককে পাঠিয়েছে।

একটি সুত্র জানায়,  সিরাজুল ইসলাম সৌদি আরবে বসে ব্যাংকের এটিএম বুথ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ইমেইল আইডি চেক করে বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিদেশে পাচার করেছে সে একজন আন্তর্জাতিক চক্রের সক্রিয় সদস্য। তার বাড়ি টেকনাফের সাবরাংয়ে।

সিরাজুল ইসলাম বাংলাদেশ এবং সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনোর হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। তাকে দেশে এনে দেশের প্রচলিত আইনে সোপর্দ করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার

ওয়াকি বহালের মতে, সময়ের সাথে বাড়ছে প্রতারণার ধরন, বাড়ছে প্রতারকের সংখ্যাও। দেশব্যাপী সাধারণ মানুষ ডিজিটাল প্রতারণার ভয়ঙ্কর ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। ইন্টারনেট, ইউটিউব, সোস্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়ার এই চক্র বেড়েই চলছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে একজন ব্যক্তির আপত্তিকর ছবি পোস্ট করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা, অশ্লীল লিংক ছড়িয়ে ব্যবহারকারীকে বিব্রত করা, কারও ফেসবুক বা ই-মেইল আইডি হ্যাক করে অর্থ দাবি করা, মোবাইলে লটারি জেতার কথা বলে বিকাশের মাধ্যমে অর্থ আদায়সহ প্রতারক চক্র বিভিন্নভাবে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝে উঠতে পারেন না ওদের প্রতারনার কৌশল।

ফলে রাতারাতি দিন পাল্টে যায় ওই বাংলাদেশী ও তার সঙ্গে জড়িতদের। তিনি হয়ে ওঠেন কোটি কোটি টাকার মালিক। শুরু করেন বিলাসবহুল জীবন যাপন। অথচ দুয়েক বছর আগে কেউ বলেন ওমরা পালনে, আবার কেউ বলেছেন, নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে প্রথম সৌদি আরবে যান সিরাজ।

আপনার মন্তব্য দিন