প্রচ্ছদ আন্তর্জাতিক এটা কোন সিনেমার গল্প নয়…

এটা কোন সিনেমার গল্প নয়…

ডেস্ক রিপোর্ট :

ধর্ষণকাণ্ডের এক প্রত্যক্ষদর্শীর মৃত্যু হলো অস্বাভাবিকভাবে। এতকিছুর পরেও পুলিশ কেস ফাইল করতে রাজী নয়! শেষমেশ নানামুখী প্রতিবাদের মুখে বাধ্য হয়ে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হলো ঠিকই, কিন্ত হুমকি-ধামকি কমলো না। গ্রেফতার হবার এক বছর পরে এসে সেই সাংসদের ইশারায় মেরে ফেলার জন্যে আপনার ওপর হামলা হলো, কপালগুণে গুরুতর আহত হয়েও আপনি প্রাণে বেঁচে গেলেও, ঘটনাস্থলেই মারা গেলেন আপনার দুই নিকটাত্নীয়। হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে অচেতন অবস্থায় শুয়ে তখন আপনি নিশ্চয়ই আর চাইবেন না আপনার জ্ঞানটা আর কখনও ফিরুক। স্রষ্টা বলে যে কেউ একজন আছেন, তিনি যে সবাইকে সমান চোখে দেখেন- এই ধারণাগুলো তখন আপনার কাছে ভীষণ মিথ্যে কিছু বুলি ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না।

আক্রান্ত গাড়ি

তেলুগু সিনেমার কোন চিত্রনাট্যের কথা বলছি না। নির্জলা সত্য ঘটনা, গত দুই বছর ধরে একের পর এক ঘটে চলেছে। ঘটনাটার শুরু ঠিক দুই বছর আগে। চাকুরীর আশ্বাস দিয়ে সতেরো বছরের নাবালিকা এক কিশোরীকে বাড়িতে ডেকেছিলেন ভারতের উত্তরপ্রদেশের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এক বিধায়ক।

কিশোরীর পরিবারের সাথে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বিধায়কের, পাশাপাশি বাড়ি, সেই সূত্রেই হৃদ্যতা। বিধায়ককে ‘দাদু’ বলে সম্বোধন করতো কিশোরী। সেই মানুষটার হাতেই সেদিন বিকেলে ধর্ষিত হতে হয়েছিল তাকে। হুমকি দেয়া হয়েছিল, কাউকে কিছু বললে খুন করা হবে তার পরিবারের সবাইকে! সেই হুমকিতে ভয় পেয়ে চুপসে গিয়েছিল নির্যাতিতা কিশোরী, চুপচাপ বাড়ি ফিরে এসেছিল সে, কাউকে কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি।

কিন্ত এর এক সপ্তাহ বাদেই তাকে আবার তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেই বিধায়কের ছোটভাই আর তার বন্ধুরা। টানা কয়েকদিন আটকে রেখে গণধর্ষণ করা হয় তাকে। সপ্তাহখানেক পরে সেখান থেকে পালিয়ে আসে ওই কিশোরী, ঘটনা জানাজানি হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার পদক্ষেপ নেয়া হয় তখনই। আর সেখান থেকেই এই ঘটনাটা সিনেম্যাটিক একটা রূপ নিতে শুরু করলো।

ধর্ষক কূলদীপ সিং

বারবার থানায় অভিযোগ জানিয়েছিল নির্যাতিতার পরিবার, কিন্ত স্থানীয় বিধায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ হওয়ায় সেটা গ্রহণই করেনি পুলিশ। ঘটনার প্রায় মাস দশেক পর, ২০১৮ সালের এপ্রিলে আদালতের নির্দেশে এফআইআর নিতে বাধ্য হয় স্থানীয় পুলিশ, কিন্ত এরপরপরেই সেই কিশোরী আর তার পরিবারের ওপর নেমে এলো দুর্যোগ, বিধায়কের লোকেরা হুমকি দেয়া শুরু হলো মামলা তুলে নেয়ার জন্যে। গতবছরের এপ্রিল মাসে বিধায়কের ভাই লোকজন নিয়ে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় মেয়েটির বাবাকে, জোর করে থানায় নিয়ে এফআইআর তুলে নিতে চাপ দেয়, কিন্ত সেটা করেননি তিনি। একদিন পরেই অস্ত্র আইনে মামলা দেখিয়ে গ্রেফতার করা হয় তাকে!

বাবাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে শুনে নির্যাতিতা সেই তরুণী ছুটে গিয়েছিল উত্তরপ্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের বাসভবনের সামনে, সেখানেই গায়ে পেট্রোল ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে। তবে নিরাপত্তাকর্মীরা সেই যাত্রায় নিবৃত্ত করে তাকে, আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় মেয়েটাকে। এরমধ্যেই খবর আসে, জেলে আটক থাকা অবস্থায় মারা গেছেন তার বাবা! পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রেফতারের আগে থেকেই নাকি তিনি অসুস্থ ছিলেন। অথচ ভদ্রলোকের পরিবার থেকে বলা হয়েছে, একদম সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষটাকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ, এটা খুন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। মৃতদেহে বেশকিছু আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল, অথচ পুলিশ তখন ময়নাতদন্ত ছাড়াই ডেডবডি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছে।

মূখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে তরুণীর আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনার পরেই সাড়া পড়ে গিয়েছিল চারপাশে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায়। দাবানলের মতো ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। বিজেপির বিধায়ক সরাসরি ধর্ষনকাণ্ডে জড়িত- মানুষের জন্যে এটা মেনে নেয়া সহজ কিছু নয়। প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠতে সময় লাগেনি খুব বেশী। এদিকে সেই বিধায়ক, কূলদীপ সিং সেনগার বুক ফুলিয়ে মিডিয়ার সামনে এসে বলে গিয়েছেন, এসবকিছুই তার বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় ষড়যন্ত্র! বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও তখন তাকে সমর্থন দিয়েছে।

যাই হোক, থানা হেফাজতে কিশোরীর বাবার মৃত্যুর পরে ভারতীয় আদালতের নির্দেশে কেসটা যায় সিবিআইয়ের টেবিলে। উত্তরপ্রদেশের পুলিশ দশ মাসে যে কাজ করতে পারেনি, সিবিআই সেটা করলো দশ ঘন্টায়। কুলদীপ সিং আর তার ভাইকে গ্রেফতার করা হলো, নেয়া হলো রিমান্ডে। এরপরে আদালতের নিয়ম অনুযায়ী তারিখের পরে তারিখ গড়িয়েছে, বিচারকাজ এগিয়েছে ঢিমেতালে।

এরমধ্যে হুমকি আসা বন্ধ হয়নি। বিধায়কের সঙ্গে লাগতে যাওয়ার ফল ভালো হবে না, এটা রোজই কেউ না কেউ মনে করিয়ে দিয়েছে তাদের। উটকো লোকজন বিরক্ত করেছে প্রতিনিয়ত, বাড়িতে হামলা হয়েছে, ফোন করে হুমকি দেয়া হতো প্রতিদিন। খুব বেশি দরকার না থাকলে বাড়ির বাইরে বেরুনো তো কার্যত বন্ধই করে দিয়ে দিয়েছিল পরিবারটা। তাতেও শেষরক্ষা হলো কই?

গতকাল পরিবারের দুই সদস্য আর নিজের উকিলকে সঙ্গে নিয়ে রায়বরেলির জেলখানায় আটক চাচাকে দেখতে যাচ্ছিলেন সেই তরুণী, তার বয়স এখন ১৯ বছর। পথিমধ্যে একটা ট্রাক তুমুল গতিতে এসে ধাক্কা দেয় তাদের গাড়িটিকে। ছোটখাটো কোন দুর্ঘটনা নয় এটা। গাড়িটা মোটামুটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, খুনের উদ্দেশ্যেই যে এই হামলা, তাতে সন্দেহ নেই কোন। ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন কিশোরীর চাচী আর তার বোন। আইনজীবি এবং সেই কিশোরী নিজে গুরুতর আহত হয়েছেন, হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তিনি এখন। জ্ঞান ফেরেনি এখনও, ফুসফুস বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে জানয়েছে ডাক্তারেরা।

ঘাতক ট্রাক, কালো কালি দিয়ে ঢাকা নম্বরপ্লেট

এদিকে পুলিশ সেই ট্রাকের ড্রাইভারকে গ্রেফতার করেছে, আটক করা হয়েছে ট্রাকের মালিককেও। ট্রাকের নাম্বারপ্লেটটা কালো কালি দিয়ে ঢাকা ছিল, মালিকের দাবী, তার পাওনাদারেরা যাতে ট্রাকের নম্বর দেখে চিনতে না পারে, সেজন্যেই নাকি নম্বরপ্লেট কালি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল! আর পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবী করেছেন, বৃষ্টিতে রাস্তা পিচ্ছিল ছিল, একারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটা গাড়িকে ধাক্কা মারতে পারে।

আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, আদালতের নির্দেশ ছিল, নির্যাতিতাকে যাতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়া হয়। একজন গানম্যান সহ মোট পাঁচজন পুলিশের একটা বাহিনী তার সঙ্গে থাকার কথা, গত এক বছর ধরেই তারা পাহারা দিয়ে আসছে এই তরুণীকে। অথচ গতকাল পুলিশের লোকজন ছিল না সেই তরুণীর সঙ্গে, তারা নাকি আসেইনি সকালে! দেরী হয়ে যাচ্ছে দেখে পুলিশের অপেক্ষা না করেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন সবাই। বলিউড চাইলে দুর্দান্ত একটা থ্রিলার বানিয়ে ফেলতে পারে এই কাহিনী থেকে। নো ওয়ান কিল্ড রীমা/সীমা/গীতা/ববিতা, যা খুশি নাম দেয়া যায় সেটার।

উত্তরপ্রদেশ এখন অরাজক এক রাজ্য। কানপুর থেকে এলাহবাদ, কিংবা বরেলি থেকে বেনারস- প্রতিটা শহরে কান পাতলেই শোনা যায় সবলের ওপর দুর্বলের অত্যাচার আর নির্যাতনের শত শত গল্প। যোগী আদিত্যনাথ পড়ে আছেন তার রামরাজ্য নির্মাণের অলৌকিক স্বপ্ন নিয়ে। এসব নির্যাতনের ঘটনা তার কান অবদি পৌঁছায় না, তার মাথায় ঘোরে শুধু সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প, তার কানে বাজে ‘মন্দির ইয়েহি বনেগা’ টাইপের ঘৃণার বীজ উৎপন্নকারী স্লোগান। ধর্ষণের বিচারের চেয়ে মন্দির নির্মাণেএ হুজুগ তোলাটা যখন শাসকের কাছে জরুরী হয়ে পড়ে, তখন বোঝা যায়, মানুষের মূল্য আসলে কত কম সেখানে!

আপনার মন্তব্য দিন