কক্সবাজার সৈকতে দখলবাজ সিন্ডিকেট বেপরোয়া

স্টাফ করেসপনডেন্ট : 

কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে রাতারাতি দোকানপাট নির্মাণের ঘটনাটি সর্বত্র এখন আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে।

গণমাধ্যম আর ফেসবুক ছাড়াও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দের মুখে মুখে বীচ দখলের রহস্য নিয়ে চলছে চুল ছেড়া বিশ্লেষন।

সেই সাথে অজানা জগত থেকে বের হয়ে আসছে বছরের পর বছর সৈকত দখল করে রাজত্ব চালানো বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেটের নাম।

যেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি থেকে খোলস পাল্টিয়ে সুবিধা দলে আশ্রয় নেয়া অনেক প্রভাবশালী দখলবাজ। যারা যুগযুগ ধরে শাসন করছে বীচের পর্যটন কেন্দ্রিক সব ধরণের ব্যবসা।

বিশ^স্থ তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনের নিচের অংশে প্রকাশ করা হয়েছে সেইসব দখলদারের নামও।

এদিকে সোমবার বিকেলে ঘটনাস্থল সুগন্ধা বীচ পয়েন্ট এবং লাবণী বীচ পয়েন্ট পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো.কামাল হোসেন ও কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান। এসময় দখল নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির নেতৃবৃন্দসহ প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক নতুন স্থাপনাসহ বালিয়াড়ির দখল করে দীর্ঘদিন ব্যবসা চালানো বেশ কিছু পুরোনো স্থাপনাও সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি লাবণী পয়েন্ট থেকে তাৎক্ষনিকভাবে বেশ কয়েকটি ভাসমান খাবারের দোকানও উচ্ছেদ করেন জেলা প্রশাসক।

এদিকে সরেজমিন অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে এসব দখল রহস্য আর বীচ রাজাদের অবৈধ রাজত্বের পিলে চমকানো অজানা তথ্য।
এখন প্রশ্ন আসছে সুগন্ধা পয়েন্টে-রাতারাতি গড়ে তোলা দোকানগুলোর প্রকৃতপক্ষে মালিক কে বা কারা ? দোকান বরাদ্দের নামে কি পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়েছে ? টপ-টু বটম কাদের হাতে সেই টাকার ভাগ যায় ? এমনকি বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যদের মধ্যে কেউ বীচ দখল কর্মকান্ডে জড়িত কিনা সেইসব রহস্যময় প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
তথ্য বলছে-বিগত ২০০৭ সালের দিকে মাত্র ৮-১০ জন হতদরিদ্র ক্ষুদ্র ঝিনুক ব্যবসায়ীকে অস্থায়ীভাবে নামমাত্র মূল্যে কিছু কার্ড প্রদান করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক।
এর কয়েক বছর পর কার্ড তথা দোকানের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৩০টির মতো করে জেলা প্রশাসন। তখন প্রতিটি কার্ডের ফি নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার টাকা।
এমতাবস্থায় সুগন্ধা বীচের বালিয়াড়িতে দোকানের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় আড়াইশ’ থেকে তিনশ’। কার্ডের সংখ্যাও দাঁড়ায় প্রায় চারশ’।
কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ৮ হাজার টাকার স্থলে প্রতি কার্ড বাবদ হকারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে তিন থেকে চার লাখ টাকা। মাঝখানে লাভবান হয়েছে কে…? ডিসি অফিস থেকে রাতারাতি কার্ড বানিয়ে দেয়া সেই দালাল সিন্ডিকেট নাকি প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ক্ষমতাবান কেউ…?।

এমন প্রশ্নও আলোচনায় আসে বারবার। যদিও চন্দনাইশ থেকে আসা হাফিজুল আলম চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি প্রশাসনকে ভুলিয়ে বালিয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কার্ড বাণিজ্য চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, এসব দোকান কেন্দ্রিক গড়ে ওঠেছে শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেটও।

যেখানে জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মচারীও সরাসরি জড়িত বলে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর মুখে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এবার তথ্য পাওয়া গেছে আরো বেশি পিলে চমকানো, তা হলো-মাত্র ৮ হাজার থেকে ৩-৪ লাখে বিক্রি হওয়া কার্ডগুলো ওই চিহ্নিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২য় বা ৩য় কোন ব্যক্তিকে বিক্রি করলে নগদ গুনতে হয় সাত থেকে আট লাখ টাকা। এমনও রয়েছে, একটি দোকান থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে দখলবাজচক্র।

যা হয়তো জেলা প্রশাসনের কেউই জানেননা। সে ক্ষেত্রে অধিকতর তদন্তে থলের বিড়াল বের হয়ে আসতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
অন্যদিকে দখলবাজ সিন্ডিকেটে বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য, স্থানীয় রাজনীতিক, আইনজীবী, সমাজপতি, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গসহ কয়েকজন কথিত সাংবাদিক পরিচয়দানকারীও রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

যারা এই মহৎ পেশাটাকে শুধুমাত্র ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে সুবিধা আদায় করে আসছে দীর্ঘদিন।
আরো অবাক করা ব্যাপার হলো, তৎকালীন প্রশাসন অসহায় হতদরিদ্র ঝিনুক ব্যবসায়ীদের দোকানগুলো বরাদ্দ দিলেও বর্তমান পরিস্থিতি তার উল্টো।
এখন যাদের নামে দোকানের কার্ড আছে তারা প্রত্যেকেই সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও সাবলম্বী ব্যক্তি। প্রকৃত ঝিনুক ব্যবসায়ী কিংবা দরীদ্র মানুষগুলো দোকানের মালিক নয়।
প্রাপ্ত তথ্য সূত্র জানায়, বীচের অবৈধ যেকোন দখলে সবসময় যাদের নাম উঠে আসে তারা হলো-সুগন্ধা বীচ পয়েন্ট পয়েন্ট ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি জালাল, সুগন্ধা বীচ ঝিনুক ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ রুবেল, সুগন্ধা বীচ ঝিনুক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রমজান ও সাধারণ সম্পাদক জাকের হোসেন, গুরা মিয়া, ফরিদ, মুরাদ, লালু, এনাম, রাসেল, যুবদল নেতা জয়নাল, মনু, হেলাল, নুরুল হুদা, আলম, আমিন, ইউনুছ।

এছাড়াও আরো অনেকেই আছেন যারা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকেন, তাদের নামও পরবর্তী তথ্যবহুল প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
এর আগে ঈদের ছুটির সুযোগে রাতের অন্ধকারে যুবদল নেতা জয়নাল, জালাল, জাকের ও গুরামিয়ার নেতৃত্বে সুগন্ধা পয়েন্টের দু’পাশে অর্ধশতাধিক দোকান নির্মাণ করা হয়েছিলো। গত দুই ঈদের রাতেও একইভাবে মার্কেট নির্মিত হয়। এবারও ঈদুল ফিতরের আগে ও পরের রাতে দু’পাশে অর্ধশতাধিক দোকান নির্মাণ করে সেই চক্রটি।

এতে প্রতিটি দোকান থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা। যদিও পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে নবনির্মিত দোকানগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়।
এদিকে সৈকতের বালিয়াড়ির উপর রাতে মার্কেট নির্মাণের বিষয়টি নজরে আসলেই জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রায় ৩০টি মতো দোকান উচ্ছেদ করা হয় শনিবার। রাতের অন্ধকারে অবৈধ মার্কেট নির্মাণে কারা জড়িত বা ইন্ধনদাতা তা বের করতে গত রোববার বিকালে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহাজাহান আলিকে প্রধান করে রোবাবার তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে সোমবার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন ও মেয়র মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সৈকতের মার্কেটগুলো পরিদর্শনও করেছেন তদন্ত কমিটি।
এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (পর্যটন ও প্রটোকল) এস.এম.সরওয়ার কামাল, সহকারী কমিশনার (পর্যটন ও প্রটোকল) মো: সাইফুল ইসলাম জয়, বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য নঈমুল হক চৌধুরী, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান নুরুল আবছার, মুক্তিযোদ্ধা মো. শাজাহান, বিটিভি’র জেলা সংবাদ প্রতিনিধি সাংবাদিক নেতা জাহেদ সরওয়ার সোহেল।
পরিদর্শনকালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, “ঈদের আগের ও পরের রাতে কে বা কারা বালিয়াড়িতে মার্কেট নির্মাণ করেছিল তিনি জানেননা। তাঁকে কেউ বিষয়টি অবগতও করেনি। তবে বিভিন্ন মাধ্যামে শনিবার সকালে মার্কেট নির্মাণের বিষয়টি জানতে পারার সাথে সাথে দুপুরের মধ্যে লম্বা একটি নির্মাণাধীন মার্কেট উচ্ছেদ করা হয়।

পাশাপাশি অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণে যারা জড়িত তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হবে বলে ঘোষনা দেন জেলা প্রশাসক। এমনকি জেলা প্রশাসনেরও যদি কেউ জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হবে বলে জানান তিনি।

আপনার মন্তব্য দিন