চট্টগ্রামে কাস্টমস কর্তাদের ১১ কোটিপতি স্ত্রী

ডেস্ক রিপোর্ট :

গৃহিণী রাফেয়া বেগমের বৈধ কোনো আয়ের উৎস নেই। অথচ তিনি দেড় কোটি টাকার মালিক। রাফেয়ার নামে রাখা হলেও দৃশ্যত এই টাকার মালিক তার স্বামী, যিনি চট্টগ্রাম কাস্টমসের একজন কর্মচারী।

স্বামী চট্টগ্রাম কাস্টমসের (শুল্ক্ক) কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেই রাফেয়ার মতো বহু গৃহিণী হয়ে যাচ্ছেন কোটিপতি। বাড়ি-গাড়িসহ অগাধ সম্পত্তির মালিক হয়ে যাচ্ছেন তারা। চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এমন ১১ স্ত্রীর সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আইনের চোখ ফাঁকি দিতে স্ত্রীর নামে সম্পদ জমিয়েছেন স্বামীরা। তবে এতেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। পরস্পরের যোগসাজশে দুর্নীতি করায় এ ধরনের মামলায় স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই আসামি করা হচ্ছে। জেলেও গেছেন কেউ কেউ।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততায় এমন অপরাধ বাড়লে সমাজে তার একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অথচ স্ত্রী তার স্বামীর অপকর্মে সহযোগী না হলে অনেকাংশেই কমে যেত দুর্নীতি।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘অসৎ উপার্জনে স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের অসম্মতি থাকলে স্বামী তা বেশি দিন চালিয়ে যেতে পারে না। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই যদি দুর্নীতি মামলার আসামি হয়, তবে সন্তানদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আবার স্বামী-স্ত্রী দু’জন দুর্নীতি মামলার আসামি হয়ে কারাগারে গেলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও সেটি ফেলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব। নিকটাত্মীয়রা যোগসাজশ করে দুর্নীতিতে জড়ালে পুরো সমাজেই একটি খারাপ বার্তা চলে যায়।’

গত ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক উচ্চমান সহকারী রফিকুল ইসলাম পাটোয়ারি ও তার স্ত্রী শাহীন আক্তারকে হালিশহর থানা এলাকার নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করে দুদক। পরে তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন চট্টগ্রামের আদালত। এ মামলায় রফিকুলের বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৮৮ লাখ ৯০ হাজার ৫৯৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। আর তার স্ত্রী শাহীনকে ‘দুর্নীতির সহযোগী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মামলা দায়েরের প্রায় এক যুগ পর তারা কারাবন্দি হন।

কাস্টম কর্মকর্তা আবদুল মমিন মজুমদার ও তার স্ত্রী সেলিনা জামান পরস্পর যোগসাজশে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন। এ ছাড়াও ৪০ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৮ টাকার সম্পদ গোপনের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। গত ১৯ মে পুলিশ মমিন মজুমদারকে গ্রেফতার করলেও তার স্ত্রী সেলিনা জামান এখনও পলাতক। আয়ের বৈধ কোনো উৎস না থাকার পরও চট্টগ্রামের হালিশহর এল ব্লকে (লেন ৩, সড়ক ২, প্লট ১৩) তিন কাঠা জমি ও আংশিক দালানগৃহ ২০ লাখ টাকায় কেনেন সেলিনা জামান। এর পর চট্টগ্রামে ছয়তলা ভবন তৈরি করেন তিনি। এর নির্মাণ ব্যয় ৬৫ লাখ ৪২ হাজার ৯৮০ টাকা। আবার কাস্টম কর্মকর্তা মমিন নিজ নামে ৫৯/২, আর কে মিশন রোডে ৭৮০ বর্গফুটের পার্কিংসহ একটি ফ্ল্যাট কেনেন। সেলিনা জামান তার আয়কর নথিতে ২০০৪-০৫ করবর্ষ থেকে ২০১১-১২ পর্যন্ত মোট ৭৪ লাখ ২৭ হাজার ১৯ টাকা আয় দেখান। অথচ এত টাকা আয় হওয়ার বৈধ কোনো উৎসই তার নেই।

একইভাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী এসএম জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী রাফেয়া বেগম ওরফে নাজমা হায়দার রাফিয়ার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি মামলা চলছে। এ দম্পতির বিরুদ্ধে মোট আড়াই কোটি টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত উপার্জন করার অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অফিস সুপারভাইজার পদে চাকরি করা এসএম জাহাঙ্গীর আলম খুলনার ফুলতলায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই ইউনিটের চারতলা বাড়ি এবং গ্রামে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একতলা আরও একটি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া তার নিজ নামে খুলনায় প্রায় ১৪ লাখ টাকার জমি রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে উচ্চমান সহকারী পদে থেকেই জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রাফেয়া বেগম দেড় কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে খুলনার সোনাডাঙ্গায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি তিনতলা বিল্ডিং, ৭৭ শতাংশ জমি ও সাড়ে ৫ লাখ টাকায় কেনা টয়োটা গাড়ি।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাবেক অ্যাপ্রেইজার আবুল কালাম আজাদ ও তার স্ত্রী মাসুমা আক্তারের বিরুদ্ধেও ৪৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৬৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৩২০ টাকার সমপরিমাণ সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে দুদক। তবে তদন্ত কর্মকর্তার ‘গাফিলতি’র কারণে মাসুমা আক্তারের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি আদালতে।

এদিকে প্রায় ৫৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং প্রায় ১৪ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অপরাধে আকতার জাহান লাইলী নামে এক গৃহবধূর বিরুদেব্দ মামলা দায়ের করেছে দুদক। লাইলী চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ শাখার সুপারিনটেনডেন্ট মনজুরুল হক চৌধুরীর স্ত্রী।

স্ত্রী, মা, বোনসহ পরিবারের ১১ জনের নামে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রাখার অভিযোগে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমীনের বিরুদ্ধে গত বছর মামলা করেছে দুদক। এ মামলায় আল আমীন ছাড়াও তার মা শরীফ হাসিনা আজিম, বোন শরীফা খানম, স্ত্রী ফেরদৌসী সুলতানা, তাদের আত্মীয় সোনালী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার রেজওয়ানুল হক, রাবেয়া আক্তার, ছালেহা বেগম, এসএম খাইরুল আলম, কাজী নাদিমুজ্জামান, এমএম হুমায়ুন কবির ও ফাতেমা বাচ্চুকে আসামি করা হয়।

কাস্টমসে চাকরির মাত্র আড়াই বছরের মধ্যেই আল আমীন সোনালী ব্যাংকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নিজ নামে ৮০ লাখ টাকার এফডিআর, তার মা শরীফ হাসিনা আজিম ও বোন শরীফা খানমের নামে ৭৫ লাখ টাকা করে দুটি এফডিআর করেন। তিনি ৩৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকায় একটি গাড়িও কেনেন। তিনি অবশিষ্ট অবৈধ সম্পদ রাখেন পরিবারের অন্য নিকটাত্মীয়দের নামে। এদিকে কাস্টমস কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন, তার স্ত্রী ও ছেলের বিরুদ্ধেও চলছে দুর্নীতি মামলা। পরস্পর যোগসাজশ করে অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করে দুদক।

এ ব্যাপারে দুদক চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন বলেন, ‘কাস্টমস কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই তাদের অবৈধ আয়ের মালিক বানিয়েছেন স্ত্রীকে। দায় এড়াতে তারা এ কৌশল নিলেও আমরা মামলার আসামি করছি স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই। উভয়কে আইনের আওতায় এনে পুরো সমাজে একটি বার্তা দিতে চাই আমরা।’

তবে কারাগারে যাওয়ার আগে কাস্টম কর্মকর্তা আবদুল মমিন মজুমদার বলেন, তিনি কিংবা তার স্ত্রী অবৈধভাবে কোনো সম্পদের মালিক হননি। তার স্ত্রী সেলিনা জামান বাবার বাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করে বাড়ি কিনেছেন। কারাগারে যাওয়ার আগে একই দাবি করেন রফিকুল ইসলাম পাটোয়ারির স্ত্রী শাহীন আক্তারও।

সুত্রঃ সমকাল

আপনার মন্তব্য দিন