জীবনের গল্প- আমি আত্মা বলছি…!

।।  আসমা আহমেদ ছোটমনি।।

সেই দিনও আমি সেজেছিলাম, তবে আজকের সাজা ও সেই দিনের সাজগুছের মধ্যে অনেক পার্থক্য!

এই বাড়িতে যে দিন প্রথম এসেছিলাম। সে দিন লাল বেনারসি শাড়িতে জড়ানো ছিল আমার পুরো দেহ। মাথায় খোপায় গুছানো ছিল লাল গোলাপ ও ঘোমটা, সারা দেহে ছিল কত অলংকার।

হাতে পায়ে ছিল মেহেদীর লাল রং আর আলতা মাখানো পা। চারদিকে ছিল মানুষের ভীড় ও উৎসব উদ্দীপনা, আনন্দ হৈ হুল্লোড়। কত মানুষ আমাকে দেখতে এসেছিল। চেহারা দেখে একজন এক এক কমেন্ট করেছিল। সে থেকে ই এই বাড়িতেই আছি মনে করেছিলাম এটাই শেষ ঠিকানা। সেই পেছনের ইতিহাস।

আরো অনেক বছর কেটে গেল। আবারো এই বাড়িতে ভীড় জমেছে। আবারো সবাই আমাকে দেখতে এসেছে। আমার চেহারা দেখে হাত দিয়ে চোখের জল মুচছে। সে দিনের মতো আজ কোন উৎসব নেই, নেই আনন্দের আওয়াজ।  চারদিকে শোকের হাওয়া। কান্নাকাটির ঢেউ। জ্বলছে মোম আর আগর বাতি। আতরে সুগন্ধে সুরভিত সুবাস চারদিন ।

আজ কিন্তু লাল টুকটুকে শাড়ি নয়, পড়াবে ধবধপে সাদা কাপড়। প্রথম যে  দিন আমাকে সবাই যত্ন করে নতুন ঘরে ডুকিয়ে ছিল। আজ সবাই আমাকে বের করার কথা বলছে। সেদিন আমি লাল শাড়িতে সেজেছিলাম। আজ সেজেছি পুরো সাদা কাপড়ে। সেদিন আমার হাতে পায়ে মেহেদীর রং ছিল,, চোখে কাজল ছিল।

আজ কিছুই নেই, চোখে দেওয়া হল সুরমা। সে দিল অলংকার ভর্তি ছিল দেহ। আর আজ!  আজ যত্ন করে তা খুলে নেওয়া হলো। হলুদের পানিতে আমার ছিল সেই দিনের গোসল, আর আজ গরম পানিতে দেয়া হচ্ছে শেষ গোসল। কেউ বাশ কাটছে, কেউ বা বানাচ্ছে টেংরা।সে দিন সাজানো ফুলের গাড়িতে করে এসেছিলাম। আজ যাচ্ছি চার জনের কাঁধে নেওয়া এক খাটিয়ায় করে। প্রথম দিন আমি কেঁদে ছিলাম, আজ সবাই কাদছে। সেই কাদন চির বিদায়ের কান্দন। পাড়া পরশী, আত্মীয় স্বজন সবাই আমার আপনজন ছিল।

অথচ আজ কারো কোন ইচ্ছা নাই আমাকে রেখে দেওয়ার। চারদিকে সবাই তাড়াহুড়ু করে নিয়ে চলছে আমায়। এরপর ছোট্ট মাঠির একটা ঘরে রাখা হলো আমায়। যেখানে নেই দরজা, জানালা, খাট পালং। যেখানে আমার এতো বড় বাড়ি আমার জন্য ছোট মনে হতো, থাকতে অসুবিধা হতো অথচ আজ ওরা আমায়৷ এমন ঘরে রাখলো যেখানে এ পাশ ও ওপাশ হওয়া যায়না।

কেউ একটুও চিন্তা করছেনা এই ঘরে আমি কিভাবে থাকবো। এর পরে আমার ওপরে বাঁশের ভেড়া দেওয়া হলো। তারপর আপন মানুষ গুলোই আমার ওপর আস্তে আস্তে মাটি চাপা দিচ্ছে। আমি হাজারো চিৎকার করছি অথচ শুনছেনা কেউ। মাটি চাপা দিয়ে সবাই আমাকে একা রেখে ঘরে ফেরলো। আর আমি !!!

পর দিন কয়েক জন আত্মীয় স্বজন আমার কবর দেখতে এলো। কয়েক ফোটা চোখের জল ফেলে ফিরে গেলো। আমি আবারও একা। এর কয়েকদিন পর আবারো আমার কবর দেখতেে এলো কেউ। এতদিনে আমার কবরে সবুজ ঘাস জন্মেছে। কয়েক মাস কেটে গেল আর কেউ আমায় দেখতে আসেনা। রাস্তার পাশে কবরস্থানে আমি শোয়ে আছি। রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটা হাজারো পথচারী মানুষের পদধ্বনি আমি শুনতে পাই। তাদের কোলাহল আমার কানে বাজে।

এখন আমাকে তেমন কেউ দেখতে আসেনা সেই আগের মতো, হয়তো সবাই আমায় ভূলে যাচ্ছে! এরপর অনেক বছর, আবারো আমার কবরের পাশে পদধনি। একই ভাবে এক চির চেনা মানুষ, কতোদিন পর…. এতক্ষণে তার চেহারাটা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে হতে পরিষ্কার হয়ে এলে একটা চরম ধাক্কা খেতে বাধ্য হলাম আমি!! এভাবে হয়তু বা ! !!

অসমাপ্ত….

আপনার মন্তব্য দিন