টেকনাফে এবার সাধারণ মানুষের কেটেছে স্বস্তির ঈদ!


শাহজাহান চৌধুরী শাহীন/ শাহ মুহাম্মাদ রুবেল :  

আমাদের বর্তমান সমাজের সবচেয়ে নিগৃহীত মানুষদের মধ্যে এখন ইয়াবা কিংবা মাদক ব্যবসায়ীরা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

বন্দুক যুদ্ধে মৃত্যুর পর এদের লাশের সৎকারটা পর্যন্ত ঠিকভাবে হয় না, এমন কি কোন কোন অভিবাবক কিংবা পরিবার মাদক ব্যবসায়ীর লাশ গ্রহণ করতেও অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

এতোদিন যাদের অবৈধ পথে অর্জিত অর্থে ভোগ বিলাসিতা করেছে, মৃত্যুর পরে লাশ গ্রহণ না করা, এমন অমানবিক দৃশ্য এখন হরহামেশাই চোখে পড়ছে।

সম্প্রতি পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত টেকনাফ হোয়াইক্যং এর মাদক ব্যবসায়ী মুফিজের লাশ নিতে তার বাবা কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে আসেনি। এধরনের অনেক দৃষ্টান্ত রয়েই গেছে।

এতো দিন মাদক ব্যবসায়ী কিংবা পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের দৌড় ঝাঁপ দেখেছি। ঈদ কিংবা কোরবানের সময় বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকার বড়ো বড়ো বিপনী বিতানগুলোতে তাদের পদচারনায় ছিল মুখর। দামী দামী পন্য কেনাকাটা করতে দেখিছি।

তাদের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল বিমান। আর বিলাসবহুল প্রাইভেট গাড়ি হাকাতে দেখেছি।প্রতি বছর ১৫ রমজানের পর তাদের ট্রাভেলিংয়ে ব্যস্ততা বেড়েই চলতো। এক প্রকার প্রতিযোগীতা শুরু হতো জামা কাপড় আর গৃহ সামগ্রি কেনা কাটায়। আর কোরবানের ঈদে চলতো দামী দামী গরু কেনার প্রতিযোগীতা।

অবৈধ অর্থে কেনা পশু কোরবানী না হলেও সমস্যা নেই, কিন্ত স্বত্তা দামের পশু বেশি দামে কেনার রেওয়াজ যেন চলমান ছিলো অনেক বছর।

গত বছর শুরু হওয়া মাদক বিরোধী অভিযানে অনেক মাদক ব্যবসায়ী বন্দুক যুদ্ধে মারা গেছেন। অনেক আত্মস্বীকৃত ইয়াবা কারবারী হিসেবে আত্মসমপর্ণ করে কারাগারে আছেন। অনেক মাদক ব্যবসায়ী আটক হয়ে কারান্তরিন। অনেকে দেশত্যাগ করেছেন, অনেকে চলে গেছেন আত্মগোপনে।৷

তালিকাভুক্ত মাদক কারবারী বেশির ভাগই তাদের সুরম্য অট্টালিকা ছেড়েছেন। হাহা করছে কোটি কোটি টাকায় বানানো অনেক প্রাসাদপ্রমো বাড়ি।

অথচ সমাজের এই বিবর্জিত মানুষগুলোই সমাজকে প্রতিনিয়ত নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি করেছেন। জিইয়ে রেখেছেন সামাজিক ব্যাধি। মাদকের থাবায় পুত্র- হত্যা করেছেন বাবা মাকে। ভাই হত্যা করেছেন ভাই কিং বা প্রতিবেশি আত্মীয় স্বজনকে। এমন নজীর অহরহ।

মাদকের কারণে অনেকের সংসার ভেঙ্গেছে। কক্সবাজার জেলার সীমান্তবর্তী থানা টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু সহ পুরো জেলা ও উপজেলা কিংবা অলিগলিতে মাদক কারবারিদের অস্তিত্ব থাকলেও অনেকেই জানেন না এবারের ঈদে বেশির ভাগ মাদক ব্যবসায়ী পরিবারে ঈদ আনন্দের আসল গল্প !

অনেকেই জানেন না এই পরিস্থির শুরু কিভাবে, কেমন হয়েছে এদের রমজান কিংবা কেমনই বা কেটেছে এবারের ঈদ? এসব নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।

দেশের শীর্ষ থাকা ইয়াবা ডন টেকনাফ সদর ইউনিয়নের এজাহার মিয়া ও তার ছেলে রিক্সা চালক নুরুল হক ভুট্টো,৷৷ মাদক ব্যবসা করে শত কোটি টাকার বিত্তবৈভবের মালিক হন। অন্তত ২০/৩০ কোটি টাকা ব্যয় করে বানান সুরম্য দুটি অট্টালিকা। এজার মিয়ার এক ছেলে বন্দুক যুদ্ধে মারা যান। সম্প্রতি আদালতের নির্দেশ টেকনাফ থানা পুলিশ এই মাদক কারবারী পরিবারের অন্তত ত্রিশ কোটি টাকার সম্পত্তি জব্দ করে রাস্ট্রের অনুকুলে নিয়ে আসেন।

এর পর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা এখন রাস্তার ফকির। ঈদে জামা কাপড় কেনাতু দুরের কথা, সেমাই চিনিও কিনতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। এছাড়াও দেশে শীর্ষে থাকা ১নং মাদক কারবারী হাজী সাইফুল করিমও পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হন সম্প্রতি। তার তিন ভাইও ইয়াবা সহ আটক হয়ে জেলে। এধরনের অনেক মাদক কারবারীর সামরাজ্য ধ্বংস হয়েছে। আরো অনেক কারবারীর ধ্বংসের পথে।      এধরনের অনেক দাপুটে মাদক কারবারির পরিবারেও এই দৃশ্য বিদ্যমান ছিল বলে অনেকের দাবী।

সবমিলিয়ে আত্মগোপনে থাকা বা পলাতক থাকা মাদক কারবারিদের বেশির ভাগ পরিবারে রমজান কিংবা ঈদ খুব একটা খারাপ না কাটলেও আবার খুব একটা ভালোও কাটেনি !

সন্তানকে নিয়ে ঈদে শিশুপার্কে ঘুরতে যাওয়ার সুখ, কিংবা ঈদে বিদেশ ভ্রমণ এতদাঞ্চলের কোনো কোনো মাদক ব্যবসায়ী পরিবারের কপালের জোটেনি। এখানে দুঃখের কিছু নেই, আবার অনেক মাদক ব্যবসায়ী পরিবারে অনুশোচনাও নেই।

সীমান্ত থানা টেকনাফের সাধারণ বাসিন্দাদের কেটেছে এবার স্বস্তির ঈদ!
টেকনাফবাসী এবার মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে পেরেছে, অনেকের কাছে এটি স্বস্তির বিষয়।

আগের বছরগুলোর তুলনায় এর পরিমাণ বেশী ছিল বলেই মনে হয়েছে। অতীতে এমন অবস্থারও সৃষ্টি হয়েছিল যে, অনেককে ঈদের দিনটি কাটাতে হয়েছে কষ্টে, অভিমানে। অর্থ অভাবে নতুন জামা কিনতে পারেনি, সব দামী জামা কিনে ফেলেছে কারবারী পরিবার। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা আর দুর্বিষহ স্মৃতি অনেকখানি ভুলতে পেরেছে টেকনাফবাসী।

গত বছরও টেকনাফের সাধারণ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারেনি। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দাপটে অনেকটা কোণঠাসা ছিল টেকনাফের সাধারণ মানুষ। টেকনাফের প্রতিটি শাখায় ছিল ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অবাধ বিচরণ।

ইয়াবা বদৌলতে ফকির, হকার, ঠেলা চালক,ভ্যান চালক, রিক্সা চালক, দোকান কর্মচারী ফুলে ফেঁপে কলাগাছে পরিণত হয়ে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা, প্রাসাদোপম অট্টালিকা,দেশে তারকা হোটেল,মোটেল, রিসোর্ট, প্রাসাদ, দুবাইয়ে ব্যবসা,অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ীর মালিক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কেউ অর্থ লগ্নি করেছেন, আবার কেউ অর্থ লগ্নি ছাড়াই করেছেন এসব অবৈধ সম্পত্তি।

আলাদিনের রূপকথার গল্পটি টেকনাফের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। আর আলাদিনের চেরাগের ছোঁয়ায় রাস্তার ফকির হয়েছে রাজা-বাদশাহ। সেই ইতিহাস পুরনো। এখন লাল বড়ি ইয়াবার ছোঁয়ায় কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধ্বংসকারী মরণ নেশা ইয়াবা বেচে অল্প দিনেই টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ভাগ্য ফুলে ফেঁপে কলাগাছে পরিণত হয়েছে। একই দৃশ্য কক্সবাজার জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বিপিএম,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন)  ইকবাল হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া সার্কেল) নিহাদ আদনান তাইয়ান  এর সঠিক  নির্দেশিকা ও নেতৃত্ব এবং টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বিপিএম বার এর সাহসী অভিযানে উল্টো কোণঠাসা এখন ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। অনেকে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন।

ফলে মাছের বাজার, শপিং মল, বিচার সালিশে, নামাজের প্রথম কাতার, রাস্তা ঘাটে দাপিয়ে বেড়ানো ইয়াবা ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি আর দাপট অনেকটা কমেছে।

যার কারণে সাধারণ মানুষ কেনাকাটা থেকে শুরু করে সবকিছু আগের মত করতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।

সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণাকে সাধুবাধ জানিয়েছেন টেকনাফের সাধারণ মানুষ। ঈদে টেকনাফের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো ছিল। সব মিলে এই ঈদে সাধারণ মানুষের মাঝে ফিরে ছিলো ঊৎবের আমেজ। আগামী কোরবানের ঈদেও এ অবস্থা বিরাজ করবে, এমনটাই আশা সকলের।

আপনার মন্তব্য দিন