টেকনাফ শিলখালীর ইয়াবা কারবারি আবুল বশরের উত্থান যেভাবে : বন্দুকযুদ্ধ মামলা থেকে বাদ যেতে মরিয়া  

।। ক্রাইম রিপোটার, নিউজ কক্সবাজার ডটকম ্।।

হঠাৎ জিরো থেকে হিরু হয়ে যান আবুল বশর আবুইল্যা। এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। অস্বাভাবিক ভাবে বিত্তবৈভবের মালিক হলেও ইতোপুবে কোন মামলা হয়নি তার বিরুদ্ধ। তবে গত ৩০ মার্চ তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় পৃথক তিনটি মামলা। এরপরেই বেরিয়ে আসে ইয়াবা আদলে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া ইয়াবা কারবারীর আবুল বশর আবুল্ল্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য। তবে তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় দায়েরকৃত তিন মামলার চার্জসীট থেকে বাদ পড়ার জন্য  বিশাল অংকের টাকার মিশন  নিয়ে মাঠে নেমেছে।

তার এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ যে ভাবেই হোক মামলার চার্জসীট থেকে বাদ পড়া। বিভিন্ন মহলের সাথে যোগাযোগ, সরকারী বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করে সাধু সাজার অপচেষ্টাও করছে বলে একাধিক সুত্রে প্রকাশ।

এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে,  অত্যন্ত সুচতুর  আবুল বশর এখনো ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মরণ নেশা ইয়াবা বিক্রি করে  যুব সমাজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে এই ইয়াবা কারবারীর সিন্ডিকেট।  এই মরণ নেশাকে ব্যবসা হিসাবে নিয়ে আবুল বশর বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক। তবে সে নিজেকে জমি ব্যবসায়ী দাবী করলেও নেপথ্যেে রয়েছে মুলত ইয়াবা ব্যবসা । তার সাথে বাহারছড়া ছাড়াও হ্নীলা ও কক্সবাজার শহর সহ বিভিন্ন স্থানের বড় বড় কারবারীরা রয়েছে। এদের মধ্যে পরিবহন সেক্টর নেতা, রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবী, জমির ব্যবসা এতো আয় সম্ভব নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জমি ব্যবসায়ী বলেন, আমি ২০০২ সাল থেকে জমি ব্যবসা করে আসতেছি। জমি ব্যবসার টাকা সীমিত, এতো টাকা জমি ব্যবসায় নেই ।আবুল বশর ইয়াবা ব্যবসা করে এতো টাকা, গাড়ী, বাড়ী করেছে, মালিক হয়েছেন কোটি টাকা, তবে তা নিঃসন্দেহে ইয়াবা ব্যবসা করেই হয়েছে। এলাকার সচেতনরা মনে করেন,বশর এতো সহসে কোটিপতি হওয়ার একমাত্র উপায় ইয়াবা কারবার। তাছাড়া কোনভাবে সম্ভব নয়। ইয়াবা কারবারের কারণে তাকে সমাজে বয়কট করেছে বলেও বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে।

কে এই আবুল বশর :

টেকনাফ থানাধীন বাহারছড়া ইউনিয়নের  উত্তর শিলখালী এলাকা মৃত আক্কল আলীর ছেলে আবুল বশর প্রকাশ আবুইল্ল্যা (৩২)। বিগত ৩-৪ আগে সাগর থেকে পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পোনা বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা বশর হঠাৎ কোটি কোটি টাকার মালিক!। গাড়ী , বাড়ি সব কিছু তার। কিভাবে সম্ভব। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে আবুল। ইয়াবা ব্যবসাকে নির্বিঘ্নে করতে একে একে বিয়ে করেন তিনটি।

প্রথম স্ত্রী ছাড়াও  মনু ও ছেন্নুর নামের রয়েছেন ২ স্ত্রী । মনু পিতার বাড়ী ইয়াবা হাটখ্যাত টেকনাফের হ্নীলায়। তার শ্বশুর টেকনাফ হ্নীলা পশ্চিম সিকদারপাড়ার মৃত মো. হোসাইন মেম্বার। আর ছেন্নুরের পিতার বাড়ী হোয়াইক্যং ঢালার দৈংগাকাটা নাম স্হানে পাহাড়ের উপরে বলে জানা গেছে। এই দুটি শ্বশুরবাড়ির লোকজনও ইয়াবা ব্যবসায় প্রতিষ্টিত।

আবুল বশরের ইয়াবা ব্যবসার সুবিধার জন্য এসব বিয়ে করেন, বিয়ে করে তিনি সফলও হন  বলে একটি নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা গেছে। আবুল বশর জমি ব্যবসায়ী দাবী করে এতোদিন ইয়াবা কারবার করে আসলেও তার বিরুদ্ধে কোন মামলা ইতোপূর্বে হয়নি, ধরাও পড়েনি ধুরন্ধর কারবারী আবুইল্ল্যা। তবে ইতোমধ্যেই ৩টি মামলার আসামী হওয়ার পর তার স্বরূপ উম্মোচন হয়েছে।

এদিকে, প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করলেও অদৃশ্য শক্তির গুনে সে রয়েছে বহাল তরিয়তে। বন্দুক যুদ্ধ,  পুলিশের উপর হামলা, ইয়াবা উদ্ধার ও খুনের মতো ঘটনার তিনটি মামলার আসামী হয়েও আবুল এখন প্রকাশ্যে ঘুরছে।

অনুসন্ধান সুত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৪ মে নেত্রকোনা সদরের মদনপুর ইউনিয়নে পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হন টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা পশ্চিম সিকদারপাড়ার মৃত মো. হোসাইন মেম্বারের ছেলে মো. ওসমান গনি (২৮)  ও মৌ. দিল মোহাম্মদের ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল (৪৫)। সম্পর্কে তারা চাচাত ভাই। আবুল বশরের ২ স্ত্রী মনুর বড় ভাই ওসমান গনি ও চাচাত ভাই মো. ইসমাঈল, এরা ছিল আবুল বশরের আসল ইয়াবা পার্টনার। নিহত ২ জনই চাকুরীর সুবাদে দীর্ঘ দিন ধরে ঢাকায় থাকতেন বলে পারিবারিক সুত্রে প্রকাশ।

ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, গত বছরের ২৪ মে দিবাগত রাতে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে এমন গোপন সংবাদ পেয়ে মদনপুরের মনাং এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। পরে মাদক বিক্রেতারা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এসময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে মডেল থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তা ও এক সদস্য আহত ছাড়াও উক্ত দুই মাদক বিক্রেতা হ্নীলা পশ্চিম সিকদারপাড়ার মৃত মো. হোসাইন মেম্বারের ছেলে মো. ওসমান গনি (২৮)  ও মৌ. দিল মোহাম্মদের ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল (৪৫) নিহত হন। ঘটনাস্থল থেকে ৭০৫ গ্রাম হেরোইন, তিন হাজার পাঁচ পিস ইয়াবা ও দু’টি পাইপগান জব্দ করা হয়।

নেত্রকোনায় পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত আবুল বশরের স্ত্রীর বড় দুই ভাই ইসমাইল ও উসমান গণি।

বশরের এই দুই পার্টনার বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর বশরের হঠাৎ জিরো থেকে হিরু হওয়ার কাহিনী উঠে আসে এলাকাবাসীর মাঝে।

পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ৩০ মার্চ টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মোহাম্মদ হোসেন (২৮) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। ৩০ মার্চ শনিবার ভোররাত সাড়ে চারটার দিকে সদর ইউনিয়নের হাবিরছড়া পাহাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাসের ভাষ্য, মোহাম্মদ হোসেন উপজেলার সদর ইউনিয়নের হাবিরছড়ার গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ইয়াবা ব্যবসায়ী ও ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক, ডাকাতি, হত্যাসহ চারটি মামলা আছে। ঘটনাস্থল থেকে দেশে তৈরি তিনটি বন্দুক, ১২টি গুলি ও দুই হাজার ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ফরহাদ, কনস্টেবল ফাহিম ও মাসুদ গুলিতে আহত হয়েছেন।

ওসি প্রদীপ কুমার দাস বলেন, ২৯ মার্চ শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে মোহাম্মদ হোসেনকে স্থানীয় জনতার সহায়তায় আটক করা হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি ডাকাতি ও ইয়াবাব্যবসার স্বীকারোক্তি দেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁকে নিয়ে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারে যায়। তাঁর সঙ্গীরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি করলে পুলিশের একজন এএসআই ও দুই সদস্য গুলিতে আহত হন। পরে পুলিশও আত্মরক্ষার্থে গুলি চালালে আটক মোহাম্মদ হোসেন পালাতে গিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হন। মোহাম্মদ হোসেন ও আহত তিন পুলিশ সদস্যকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে কক্সবাজার নেওয়ার পথে মোহাম্মদ হোসেন মারা যান।  এ ব্যাপারে টেকনাফ থানা পুলিশ বাদি হয়ে পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করেন। (টেকনাফ থানার মামলা নং-৮৫, ৮৬ ও ৮৭, তাং-৩০/০৩/২০১৯।

এই তিনটি মামলায় এজাহার নামীয় ১২ নং আসামী হচ্ছে টেকনাফ থানাধীন বাহারছড়া ইউনিয়নের  উত্তর শিলখালী এলাকা মৃত আক্কল আলীর ছেলে আবুল বশর প্রকাশ আবুইল্ল্যা (৩২)।মামলার পর কিছুদিন আত্মগোপনে চলে গেলেও তিনি এখন প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরাফেরা করছেন।

এলাকাবাসীর দাবী, গোয়েন্দা নজরদারীতে আনলে বশরের ইয়াবা কারবারে তার এতো সম্পদের আসল কাহিনী বেবিয়ে আসবে ।

এব্যাপারে আবুল বশর আবুল্ল্যার সাথে যোযোগ করা হলে, তিনি দাবী করেন, আমি একজন জমি ব্যবসায়ী। নেত্রকোনা নিহত ইয়াবা কারবারী ইসমাঈল ও উসমান গণি তার সম্মন্ধি (স্ত্রীর বড় ভাই) বলে স্বীকার করেন।

তিনি আরো বলেন, আমি ইয়াবা ব্যবসা করলে পুলিশ আমাকে এতোদিন ধরেনি কেনো।

তিনটি মামলার প্রসঙগে িআবুল বশর বলেন, পুলিশ য়ড়যন্ত্র মুলক ভাবে তাকে আসামী করেছে। এবিষয়ে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে দাবী করেন। এছাড়াও তাকে এই তিনটি মামলা থেকে পুলিশ বাদ দিবে বলেও অপকটে স্বীকার করেন।

আপনার মন্তব্য দিন