দুষ্টু চক্রের ঘুরপাকে একজন মানুষ গড়ার কারিগর’

নিউজ কক্সবাজার.কম রিপোর্ট :

মাস্টার সৈয়দ আকবর। দক্ষিণ চট্টগ্রামের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী কিশলয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের প্রতিষ্ঠাকালিন শিক্ষক। সবাই তাকে ‘সৈয়দ আকবর স্যার’ হিসেবে চেনে। শিক্ষক হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। তিনি একজন সফল অভিভাবকও বটে। কিন্তু শিক্ষকতা পেশার প্রায় দুই তৃতীয়াংশে পৌঁছে হোঁচট খেয়ে বসেন। ২০১২ সালের ১ অক্টোবর তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিষ্কার করা হয়। সেই থেকে অদ্যবদি প্রায় ৬টি বছর মহান শিক্ষকতা পেশার বাইরে। মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ঘুরছেন অফিস-আদালতে। খোঁজছেন মুক্তির পথ।
মাস্টার সৈয়দ আকবরের স্ত্রী একজন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। বড় মেয়ে একই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশের পর মেডিকেলে পড়াশোনা শেষ করে এখন কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ডাক্তার হিসেবে কর্মরত।
দ্বিতীয় সন্তান (মেঝ মেয়ে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তৃতীয় সন্তান (বড় ছেলে) রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়ছে। মেঝ ছেলে কিশলয়ে দশম (বিজ্ঞান) শ্রেনী এবং সবার ছোট মেয়ে সন্তানটি জেএসসিতে জিপিএ-৫ নিয়ে একই স্কুলে ষষ্ট শ্রেণীতে পড়ছে। বলতে গেলে সৈয়দ আকবর একজন সফল পিতা।
৬ বছর ধরে চাকুরী না থাকায় তাকে মারাত্নক অর্থদৈন্যতা পার করতে হচ্ছে। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে রীতি মতো হিমশিম খাচ্ছেন মাস্টার সৈয়দ আকবর।
তবে, মানুষ গড়ার এই কারিগর নিজের পদটি ফিরে পাওয়ার প্রত্যয়ে দীর্ঘ ছয়টি বছর শিক্ষাবোর্ড, হাইকোর্টসহ বিভিন্ন দপ্তরের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরছেন। মিথ্যা অভিযোগে শিক্ষকতা থেকে বহিস্কারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন। অবশেষে আইনি লড়াইয়ে সফল হয়েও কূটচালে ঘুরপাক খাচ্ছে চাকুরী। কাটছেনা শনিরদশা।
আদালত ও শিক্ষা বোর্ডের আদেশে কর্মস্থলে যোগ দিতে বাধাগ্রস্ত হন সৈয়দ আকবর। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পাত্তা দিচ্ছেনা স্কুল কর্তৃপক্ষ। তাকে পুনর্বহালের এজেন্ডা উত্থাপনের ভয়ে গত চার-পাঁচ মাসে স্কুল ম্যানেজিং সভা পর্যন্ত ডাকা হয়নি-এমন তথ্য সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগের আঙ্গুল ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দিকে।
একটি সুত্র জানিয়েছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবিরের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী বরখাস্তকৃত শিক্ষক সৈয়দ আকবর। তিনি স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হওয়ায় শিক্ষক, পরিচালনা কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট সবার অদ্যোপান্ত জানেন। গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাকে পুনর্বহালে অনীহা কয়েকজন শিক্ষক ও সদস্যের। হাতেগুনা কয়েকজনের কারণে সৈয়দ আকবরের মতো দক্ষ-অভিজ্ঞ একজন শিক্ষককে স্কুল থেকে হারাতে চাচ্ছেনা সিংহভাগ অভিভাবক ও স্কুল পরিচালক।
সুত্র জানায়, ১৯৮৫ সাল থেকে স্কুলে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত ছিলেন সৈয়দ আকবর। শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সর্বমহলের কাছে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য। একজন ‘আদর্শ শিক্ষক’ হিসেবেও সুখ্যাতি আছে তার। ২০১২ সালের ১ অক্টোবর তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিষ্কার করে তা অনুমোদনের জন্য চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডে আবেদন করে তৎকালীন স্কুল পরিচালনা কমিটি। বোর্ডের ৩৪ তম আপীল এন্ড আরবিট্রেশন এর সিদ্ধান্তে তা বিধি মোতাবেক না হওয়ায় অনুমোদন না করে সৈয়দ আকবরকে কর্মস্থলে পুনর্বহাল করতে ম্যানেজিং কমিটিকে আদেশ দেয়। শিক্ষাবোর্ডের সেই সিদ্ধান্ত অমান্য করে হাইকোর্টে ৪৩২/১৪ রীট পিটিশন দায়ের করেন স্কুল পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি মরহুম নুরুল আবছার হেলালী। ওই মামলা ২০১৫ সালের ৩০ আগষ্ট দুপক্ষের শুনানী শেষে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, চট্টগ্রাম এর আপীল এন্ড আরবিট্রেশনের আদেশ বহাল রেখে রায় দেয় আদালত।
আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে সিএমপি-৯৫৩/১৫ এবং সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপীল নং-১১৭৭/১৬ দায়ের করেন তৎকালীন সভাপতি। যা শুনানী শেষে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর (ডিসমিস) খারিজ হয়ে যায়। রায় প্রদান করেন সুপ্রিমকোর্টের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া, সাইয়েদ মাহমুদ হোসাইন, মোহাম্মদ ঈমান আলী ও হাসান ফয়েজ ছিদ্দিকীর বেঞ্চ।
শিক্ষাবোর্ড ও আদালতের রায়ের পরে সৈয়দ আকবর স্বপদে যোগদানে কোন আইনি জটিলতা নেই। অভিযোগ হলো-স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি জয়নাল আবেদীন ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবিরই মূলতঃ জটিলতা তৈরী করেছেন। তারা কোন আদেশ মানতে নারাজ।
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষাবোর্ড ও আদালতের রায়ের পর শিক্ষক সৈয়দ আকবর বিদ্যালয়ে পুনঃযোগদানের ইচ্ছা পোষণ করে আবেদন করেন। তার আবেদনের আলোকে তৎকালীন সভাপতি রেজাউল করিম খাঁন ২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে নিয়োগ প্রদানপূর্বক অফিস আদেশ জারি করেন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির শিক্ষক সৈয়দ আকবরকে কর্মস্থলে উপস্থিত হতে বাধা প্রদান করেন। এমনকি বেশ কয়েকবার তাকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগি শিক্ষক সৈয়দ আকবরের কাছে জানতে চাইলে বলেন, শিক্ষাবোর্ড ও আদালতের রায়ের আলোকে কর্মস্থলে যোগদান করতে গেলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির আমাকে বাধা দেয়। উল্টো আমার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এরপর বিদ্যালয়ে পুনঃযোগদানের অনুমতি চেয়ে বিগত ১ ফেব্রুয়ারী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিগত ৬ মার্চ আমাকে কর্মস্থলে পুনর্বহাল করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা অনুসারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিগত ১৭ মার্চ কর্মস্থলে পুনর্বহাল করতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড চট্টগ্রামকে নির্দেশ দেয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, চট্টগ্রাম সেই আদেশ মতে বিগত ১৮ জুলাই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জয়নাল আবেদীন ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবিরসহ ম্যানেজিং কমিটির অপরাপর সদস্যবৃন্দ বরাবর আমাকে কর্মস্থলে পুনর্বহালের আদেশ দেন।
সৈয়দ আকবর বলেন, আদেশ পাওয়ারও কর্মস্থলে যোগদানের জন্য ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বরাবর দু’দফা লিখিত আবেদন করি। অনেকবার দেখা করা সত্ত্বেও কোন ধরণের প্রতিকার পাইনি। আমি একজন স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হয়ে আমার সাথে অমানবিক আচরণ করছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। আমি প্রতিকার চাই।
স্কুলের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বোর্ডের আদেশ পাওয়ার পরই স্কুল পরিচালনা কমিটির সংখ্যাগরিষ্ট সদস্য সৈয়দ আকবরকে পুনর্বহালের পক্ষে। সবাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল কবির ও সভাপতি জয়নাল আবেদীনকে কমিটির মিটিং আহবান করার অনুরোধ করেন। কিন্তু মিটিং না ডেকে সৈয়দ আকবরকে পুনর্বহাল না করতে তালবাহানা করতে থাকেন।
স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম খাঁনের কাছে জানতে চাইলে বলেন, শিক্ষা বোর্ড ও উচ্চআদালতের আদেশ মতে তাকে পুনঃবহালে কোন বাধা নাই। বিগত চার-পাঁচ মাস ধরে কোন মিটিং না হওয়াতেই বিষয়টি আটকে আছে।
স্কুল ম্যানেজিং কমিটির বর্তমান সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, আমি দায়িত্বে এসেছি প্রায় চার মাস। এর আগে দুই-তিন জন সভাপতি চলে গিয়েছেন। তাদের সময়কালের যেসব কাগজপত্র পেয়েছি তার আলোকে আমরা কাজ করছি।
তিনি বলেন, মাস্টার সৈয়দ আকবর মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। আদালতের মামলা এখনো চলমান, নিষ্পত্তি হয়নি। সেবিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার, ইউএনওকে জানিয়েছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাস্টার নুরুল কবিরকে বেশ কয়েকবার ফোন দিলে রিসিভ করেননি। বরং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরুদ্দিন মোহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, এটা সম্পূর্ণ শিক্ষাবোর্ড ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্ব। অনেক কিছু আমাকে বলা হয় না, অনুলিপি দেয়া হয় মাত্র। হাইকোর্ট ও শিক্ষাবোর্ডের আদেশের অনুলিপি ম্যানেজিং কমিটি বরাবর পাঠিয়ে দিয়েছি। সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্কুল কমিটির সভাপতির। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য তাদেরকে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগেও ওই অভিযোগ নিয়ে সরেজমিন তদন্ত করেছিলাম।
এ প্রসঙ্গে জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ সালেহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুলের একজন শিক্ষক নিয়ে এমনটি হওয়া উচিত মনে করিনা। আদালত ও শিক্ষাবোর্ডের আদেশ থাকলে- তা বাস্তবায়ন করবে জানি। তাতে অনীহা কেন? বুঝে আসেনা। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে ২৫ নভেম্বর বৈঠক ডাকা হয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত করে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে। উচ্চআদালতের আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কারো নেই বলে মন্তব্য করেন জেলা শিক্ষা অফিসার।
আপনার মন্তব্য দিন