বিশ্বের বড় শরণার্থী শিবিরে মোনাজাতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গা

                              রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর পূতির্-

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন ॥

কক্সবাজারের উখিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর পূর্তি সমাবেশ। রোববার ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর পূর্তিতে এসে বড় ধরনের শোডাউন করে রোহিঙ্গারা। কুতুপালংয়ের ৪ নম্বর ক্যাম্পের বর্ধিত অংশের মাঠে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরনে ছিল তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যগত পোষাক সাদা সার্ট, পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি।

সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ সমাবেশে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গার সমাবেশ ঘটে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। মিয়ানমারের রাখাইনে হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় নিহতদের স্মরণে দোয়া মাহফিলের মোনাজাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মোনাজাতে নিজেদের নাগরিক অধিকার ও আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের জন্যও দোয়া কামনা করা হয়। সমাবেশে মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা নুরুল ইসলাম।

রোহিঙ্গা সমাবেশে বক্তারা বলেন, নিজেদের নাগরিক অধিকার ও হারানো ভিটে-মাটি ফিরে পাওয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ থেকে আলোচনা করা হয়। ৫ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমার ফিরবে না। কারণ, মিয়ানমার সরকারের উপর আস্থা রাখা হবে রোহিঙ্গাদের জন্য চরম বোকামি। তারা মিয়ানমারকে বিশ্বাস করে না।

রোববার (২৫ আগস্ট) সকালে উখিয়ার ক্যাম্প এক্স:-৪ এ দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মহাসমাবেশে এসব কথা বলেন রোহিঙ্গা নেতারা। এ সময় উপস্থিত লাখ লাখ রোহিঙ্গা তাদের অধিকার ফিরে পেলে মিয়ানমার ফিরবেন বলে হাত তুলে মত দেন।
রোহিঙ্গা সমাবেশে ঘোষণাকৃত দাবি হচ্ছে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক হিসেবে তাদেরকে মেনে নিতে হবে। নিরাপত্তা ও অবাধে চলাচলের স্বাধীনতা দিতে হবে। নিজেদের হারানো ভিটে-মাটি ফেরত দিতে হবে। ২৫ আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের বিচার করতে হবে।

আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটির নেতা মাস্টার মুহিব উল্লাহ বলেন, মিয়ানমার সেনা ও মগদের নির্যাতনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে মহাসমাবেশ করেছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গারা এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে শুধু অধিকার ফিরে পেতে।
তিনি বলেন, আমরা নিজেদের দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কখনো ফিরবো না।

রোহিঙ্গা নেতা আব্দুর রহিম বলেন, বাংলাদেশে থাকার ইচ্ছে আমাদের নেই। তবে বিপদে পড়ে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভিটে মাটি থেকে আজ আমরা শরণার্থী। আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের সরকার, নাগরিকের প্রতিকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তবে দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা ফিরে গেলে আবারও নির্যাতন হতে পারে, এমন আশংকা করেন তিনি।

মিয়ানমার সরকার আলোচনার কথা বলে আমাদের সাথে প্রতারণা করছে উল্লেখ্য করে রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, যেখানে গত বৈঠকে আরো আলোচনার সিদ্ধান্ত হয় সেখানে হঠাৎ প্রত্যাবাসনের ঘোষণা দেয় মিয়ানমার সরকার। কিন্তু বৈঠকে দাবি মানার বিষয়ে আরও আলোচনার কথা বলাহয়ে ছিল, সেখানে প্রত্যাবাসনের ঘোষণা ছিল পুরোপুরি হাস্যকর।

সমাবেশে আসা রোহিঙ্গা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে দাবিগুলো দেয়া হয়েছে তা আমাদের অধিকার। মিয়ানমার সরকার আমাদের অধিকার দিতে রাজি নয়, তাই এত চলনা করছে। দাবি না মানা পর্যন্ত মিয়ানমারে ফিরে যাবো না। এছাড়াও মধুছড়া ক্যাম্প ও ২৪ নং ক্যাম্পসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে সমাবেশ করেছে রোহিঙ্গারা।

সবার হাতে ছিল পতাকা, ব্যানার-পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড। দোয়া মাহফিল ছাড়াও। সর্বস্তরের রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে ডাকা এ সমাবেশ ঘিরে প্রায় এক হাজার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন ছিল বলেও জানান কুতুপালয় লম্বাশিয়া ১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মোহাম্মদসহ রোহিঙ্গা নেতারা। রোহিঙ্গা সমাবেশে দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতি অনুষ্টানের আয়োজন ছিল।

প্রসংগ, রোববার ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৭ সালের এ দিনে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। এরপর থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।

আপনার মন্তব্য দিন