ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিষ খাওয়াচ্ছি আমরা?

শিশুর শরীর গঠন ও পুষ্টিসাধন এবং প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থ ও নিরোগ জীবন নিশ্চিতে যে খাদ্য-উপাদানগুলোর ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুধ। দুধকে বলা হয় সুপার ফুড বা সর্বগুণসম্পন্ন খাবার। এর মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি-১২, নিয়াসিন ও রিবোফ্লোবিনের মতো পুষ্টি উপাদান৷ তাই বিশেষত শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশে দুধ একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য-উপাদান।

গত বছরের মে মাসে দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ‘পাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশই নিরাপদ নয়’ মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয়।  সংবাদপত্রের সেসব প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনা হলে আদালত এ বিষয়ে একটি রিট আবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়ে আইনজীবী তানভীর আহমেদ হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে ওই রিটের শুনানি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটিকে  বাজারে পাওয়া যায় এমন সব ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধের মান পরীক্ষাপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য  নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত।

সম্প্রতি আদালতে জমা দেয়া বিএসটিআই এর তথ্যবিবরণী থেকে জানা যায়, বাজারে থাকা ১৪টি ব্র্যান্ডের ১৮টি পাস্তুরিত/ইউএইচটি দুধ পরীক্ষা করে আশঙ্কাজনক কিছু পাওয়া যায়নি। যদিও অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদের গবেষকেরা জানিয়েছেন যে বাজারে প্রচলিত ৭টি পাস্তুরিত দুধে মানব-চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে, যা মানবদেহের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ তথ্য প্রচারের সাথে সাথে সঙ্গত কারণেই দেশব্যাপী সচেতন মানুষদের মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি হয়েছে। কেননা অ্যান্টিবায়োটিক রোগ প্রতিকারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হলেও মানুষের শরীরে এর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক বিষয়ে বর্তমান পৃথিবীতে সবচাইতে আশঙ্কার জায়গাটা হচ্ছে, গবেষকেরা ধারণা করছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প খুঁজে পাওয়া না গেলে খুব শীঘ্রই এটি পুরোপুরি অচল হয়ে যাবে; ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটি মানুষ মারা যাবে সুপারবাগের আক্রমণে। সুপারবাগ হচ্ছে সেসব ব্যাকটেরিয়া যেগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার সক্ষমতা অর্জন করে। মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে৷ সুতরাং দেখা যাচ্ছে, অ্যান্টিবায়োটিক রোগ প্রতিকারে কার্যকরি হলেও মাত্রারিক্ত ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া দমনে এর কার্যকারিতা হারায়। তাই বর্তমান সময়ে মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্ক হবার দিকে নজর দিতে চান।

এসব দিক বিবেচনায় শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক থেকে দূরে রাখার বিকল্প নেই৷ অথচ দেশে শিশুখাদ্য হিসেবে বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে৷ এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক সংবাদ- সন্দেহ নেই।

ইতোপূর্বেও পাস্তুরিত তরল দুধে মানবদেহের পক্ষে ক্ষতিকারক নানাবিধ উপাদান পাবার অভিযোগ উঠেছে। তবে এর চাইতেও ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, দেশে বর্তমানে নকল দুধ তৈরির প্রবণতাও লক্ষ করা যাচ্ছে৷ ছানার পানির সঙ্গে মিল্ক পাউডার, দুধের ননী, সয়াবিন, হাইড্রোজ, লবণ, চিনি, ফরমালিন ও কালার ফ্লেভার ইত্যাদি মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে এসব নকল দুধ। পাশাপাশি, তরতাজা রাখার জন্য ছানার সাথে মেশানো হচ্ছে ফরমালিন৷ এসব ফরমালিনের দ্বারা লিভার ও কিডনি আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও গরুর দুধে পাওয়া যাচ্ছে সিসা ও ক্রোমিয়ামের মতো উপাদান যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এমন পরিস্থিতিতে এসব কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সত্বর আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জারুরি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হতে হবে৷ নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকারের সাথে সম্পর্কিত সংস্থাগুলোকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে৷ যে কোনো মূল্যে এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে প্রতিহত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

আপনার মন্তব্য দিন