ভারপ্রাপ্ত স্বামী

।।  রিহাব মাহমুদ ।।

দীর্ঘসময় ধরে ঘরে একা পেয়ে বন্ধুর স্ত্রীকে সে কতক্ষণ সম্মান করবে? যদি সে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তখন কি করবে নাবিলা?

মূর্তির মতো বসে আছে নাবিলা। মুখে বলার মতো কোনো ভাষা সে খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ মনের ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সামনে অতি ব্যস্ত মানুষটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু তা সে করতে পারছে না। এই না পারাটাই তাকে কষ্ট দিচ্ছে বেশি। একবার ইচ্ছে হলো ঝাঁপিয়ে পড়ে, কামড়ে রক্তাক্ত করে ফেলে। অনেক কষ্টে অদম্য ইচ্ছেটাকে দমন করল নাবিলা।

উল্লাস তখন মহাউৎসাহে নিজের লাগেজ গোছাতে ব্যস্ত। অথচ এই কাজটা বরাবর নাবিলাই করে দেয়। আজ নাবিলা কোনোকিছুতে আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যেই শুনেছে উল্লাস একসপ্তাহের জন্য নেপাল যাচ্ছে ট্যুরে, তখন থেকে মন এবং মেজাজ দুটোই একসঙ্গে খারাপ হতে শুরু করেছে। যত সময় যাচ্ছে, তার মাত্রা আরও বাড়ছে। নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে সে। মেজাজ আরও খারাপ হয়েছে উল্লাসের কথা শুনে।

নাবিলা যেই না বলার চেষ্টা করল- আমি একা একা কীভাবে থাকব এই কয়দিন? তখনি দ্বিগুণ উৎসাহে উল্লাস জানাল- কি যে বলো না তুমি! মাত্র এক সপ্তাহই তো। আবিরকে বলে দিয়েছি। ও তোমাকে সময় দেবে। তুমি একদম লোনলি ফিল করবে না। তা ছাড়া ও সব দায়িত্ব পালন করবে। আমি ওকে বলে দিয়েছি- আমার অবর্তমানে তোমার যেন কোনো কষ্ট না হয়।

এর মানে কী? স্বামীর সব দায়িত্ব আরেকজন কীভাবে পালন করে? আর যাকে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছে, সে তো উল্লাসের মতোই একজন পুরুষ। উল্লাসের ছোটোবেলার বন্ধু। এখনো বিয়ে করেনি। উল্লাসের কথা শুনে মনে হচ্ছে, আবির এই কয়দিন উল্লাসের জায়গা নেবে। অর্থাৎ এই নির্জন ফ্ল্যাটেই নাবিলার সঙ্গে থাকবে? এটা কীভাবে সম্ভব? উল্লাস কি পাগল হয়ে গেল?

নাবিলা আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল উল্লাসের দিকে।

– আবির কি আমার সাথে একই ফ্ল্যাটে থাকবে?

উল্লাস ব্যাগের চেইন লাগাচ্ছিল। নাবিলার প্রশ্নে থতমতো খেয়ে তাকাল। কিছু চিন্তা করল। এগিয়ে এসে নাবিলার পাশে বসল।

-তোমার কি একা থাকতে ভয় করবে রাতে?

– যদি করে?

– তাহলে আবির না হয় গেস্টরুমে ঘুমাবে।

– এতে তুমি খুশি হও?

– আমার খুশি হওয়া না হওয়ার ব্যাপার না। তুমি একা থাকবে তাই…

– ও। স্ত্রী বাসায় একসপ্তাহ একা থাকবে, তাই স্বামী তার বন্ধুকে স্ত্রীর পাশে থাকার দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছে। ভালো।

– তুমি বুঝার চেষ্টা করো নাবিলা। আমাদের কাছাকাছি কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। এই মুহূর্তে আমি তোমাকে কার কাছে রেখে যাব। আবির আমাদের পারিবারিক বন্ধু। ওর সঙ্গে আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো। তাই…

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল নাবিলা। বলল, ঠিক আছে। তুমি যা ভালো মনে করো।

নাবিলা মনে মনে একটা কঠিন শপথ নিলো কিন্তু তা সে চেহারায় প্রকাশ করল না। স্ত্রী মেনে নিয়েছে ভেবে উল্লাস খুশিমনে নাবিলার কপালে আলতো ঠোঁট ছোঁয়ালো। অন্য সময় হলে নাবিলা এই স্পর্শটাকে আলিঙ্গন করত কিন্তু এই মুহূর্তে তার মনে ঘৃণার জন্ম নিল।

উল্লাস চলে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর আবির উপস্থিত। হাতে একগাদা ফল। নাবিলার অন্য রকম একটা অনুভূতি হলো। আবির এ বাসায় নতুন না। বহুবার এসেছে। রাতে থেকেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়েছে। কখনো এরকম মনে হয়নি। কিন্তু আজ এরকমন অনুভূতি কেন হলো, তার কারণ আর খুঁজতে গেলো না নাবিলা। আজ সে ঘরে একা। রাতেও একা। এক সপ্তাহের জন্য একা। তার একাকিত্ব ঘুচাতে আবিরের আবির্ভাব। এই ব্যবস্থা তার স্বামীই করে দিয়েছে।

– বাসায় রান্নাবান্না আছে তো ভাবী? নাকি রান্নাঘরে ঢুকব?

নাবিলা তার রান্নাঘর কাউকে শেয়ার করতে দিতে রাজী নয়। ওটা তার একান্তই নিজস্ব। আবিরের এই কথায় সে মৃদু হাসল।

– তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না, আবির ভাই। রান্না করা আছে। খাবার আগে গরম করে খাব। এখন কি তোমাকে চা করে দেব?

– হলে মন্দ হয় না। তোমার জন্য ফলফ্রুট এনেছি। খাও।

নাবিলা এই কথার কোনো জবাব দিলো না। আবির ড্রইংরুমে টিভি খুলে বসল। নাবিলা চলে এলো কিচেনে। চায়ের পানি বসিয়ে শোবার ঘরে এলো। তার খুব কান্না পাচ্ছে। উল্লাসটা এমন করতে পারল? হোক ঘনিষ্ট বন্ধু। তাই বলে ঘরে একা স্ত্রীর সঙ্গে কেউ কি তার বন্ধুকে রেখে যায়। উল্লাসের মনে কি কোনো সন্দেহ জন্মাবে না? এক সপ্তাহ পর যখন সে ফিরে আসবে তখন কি তার মনে কোনো প্রশ্ন উঁকি মারবে না? আর আবিরতো একজন পুরুষ মানুষই। তার মনেও কি এই ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে আবিরকেও বা কতক্ষণ বিশ্বাস করা যায়। দীর্ঘসময় ধরে ঘরে একা পেয়ে বন্ধুর স্ত্রীকে সে কতক্ষণ সম্মান করবে। যদি সে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তখন কি করবে নাবিলা? যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়, তাহলে দোষটা কার? আবিরকে কীভাবে দোষ দেবে? উল্লাসই তো তাদের সুযোগ করে দিয়ে গেল।

নাবিলা বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে কিছু চিন্তা করল। তারপর উঠে নিজেকে স্বাভাবিক করল। এতক্ষণে চায়ের পানি হয়ে যাবার কথা। পা বাড়াতে যাবে তখনি মনে হলো দরজার পাশ থেকে কেউ সন্তর্পনে চলে গেল। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল নাবিলার।

চায়ের সাথে কিছু নাস্তাও দিল নাবিলা। তা পেয়ে খেলা দেখতে বসে গেল আবির। এতক্ষণে উল্লাসের পৌঁছে যাবার কথা। নাবিলা ফেসবুক, ইমু চেক করল। না অনলাইনে নেই উল্লাস। নাবিলা মোবাইলটা নিয়ে আবিরের কাছে গেল। আবির তখন মনযোগ দিয়ে ক্রিকেট খেলা দেখছে। নাবিলা কিছুক্ষণ আবোল-তাবোল গল্প করল তার সাথে। দু’জনে বেশ হাসাহাসি করল। একপর্যায়ে নাবিলা আবিরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে গল্প শুরু করল। প্রথমে একটু ইতস্তত করেও পরে বেশ স্বাভাবিক হলো আবির। এই সুযোগে নাবিলা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে কয়েকটা সেলফি তুলে নিল। তারপর আবিরকে আসছি বলে চলে এলো শোবার ঘরে।

দরজা আটকে খাটে শুয়ে ছবিগুলো চেক করল নাবিলা। খুব ঘনিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত একটা ছবি সিলেক্ট করে আবিরের ফেসবুক ইনবক্স ও ইমোতে ছবিটা শেয়ার করে ক্যাপশন লিখল- এই মুহূর্তে ভারপ্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে। ক্যাপশনটা ঠিক আছে কি না বলো, স্ট্যাটাসটা পোস্ট করার আগে তোমাকে দেখিয়ে নিলাম।

এইবার অপেক্ষা। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল মনে নেই। মোবাইলে শব্দ হচ্ছে। ইমোতে কল দিয়েছে উল্লাস। নাবিলা রিসিভ করতে গিয়েও থেমে গেল। না। জ্বলুক সে। নাবিলা কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল উল্লাসের ছবির দিকে। রিং থেমে গেল। জানে আবার বাজবে। হলোও তাই। এইবার নাবিলা উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে পরখ করে নিল।

ড্রইংরুমে এসে দেখে সোফায় নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে আবির। রাত তখন ১০টা। নাবিলার খুব হাসি পেল। আবিরের মোবাইলটা সামনে পড়ে আছে। নাবিলার মনে হলো উল্লাস তার কাছ থেকে কোনো রেসপন্স না পেয়ে আবিরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। নাবিলা দ্রুত মোবাইলটা নিয়ে সুইচ অফ করে দিলো।

রাত তখন ১টা। ঘুম আসছে না নাবিলার। ১২টার দিকে আবিরকে ডেকে একসাথে রাতের খাবার খেয়েছে। খাবার টেবিলে হালকা রসিকতা ছাড়া তেমন কোনো কথা হয়নি। গেস্টরুমটা গোছানোই ছিল। আবির গুড নাইট জানিয়ে শুতে গেল। কারণ খুব সকালে তাকে কাজে বের হতে হবে। এর আগে নাবিলার প্রয়োজনীয় কিছু লাগবে কি না, জানতে চেয়েছিল আবির, কারণ সন্ধ্যার আগে সে ফিরবে না। জবাবে না বলেছে সে।

নাবিলা ফেসবুক ও ইমো চেক করে দেখেছে। উল্লাসের টেনশনজনিত মেসেজে ভরে গেছে। দেখেই মোবাইল অফ করে রেখেছে। বাইরে খট করে শব্দ হয়েছে মনে হলো নাবিলার। দরজা ভেতর থেকে আটকানো। দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে। এরকমটা কেন মনে হচ্ছে বুঝতে পারছে না নাবিলা। তার কেমন যেন শীত শীত লাগছে! আবির কি ঘুমিয়ে পড়েছে? নাকি নাবিলার রুমের বাইরে অপেক্ষা করছে? সাবধানে বিছানা থেকে নামল সে। খালি পায়ে দরজার পাশে চলে এলো। দরজার বাইরে কারো চাপা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল সে। আসলেই কি, নাকি হেলুসিনেশন?

নাবিলা খুব সাবধানে দরজা খুলল। খোলার সময় এত সাবধানতা অবলম্বন সত্ত্বেও খুট করে শব্দ হলো। তখনি মনে হলো কেউ একজন দ্রুত পায়ে চলে গেছে। নাবিলা দরজা বাইরে এসে তাকিয়ে দেখল- কোথাও কেউ নেই। ডাইনিংয়ে স্বল্প আলোর একটা বাল্ব জ্বালিয়ে রেখেছিল। তার আলো এদিকেও আসছে। নাবিলা গেস্টরুমের দিকে পা বাড়াল।

গেস্টরুমের দরজা খোলা। ডিম লাইটের আলোতে দেখল আবির শোয়া অবস্থাতেই ওপাশ ফিরল। অর্থাৎ সে ঘুমায়নি। কোনোকিছু না ভেবে নাবিলা ভিতরে ঢুকে বিছানার পাশে চলে এলো। তখনি চট করে ফিরে তাকিয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল আবির।

উল্লাস নেপাল গেছে আজ তিনদিন। বিকেলে চোখটা লেগে এসেছিল নাবিলার। আবির বাসায় নেই। সকালে কাজে গেছে। রাতে ফিরবে এরকমই বলে গেছে সকালে। সারাদিন একা একা এটাসেটা কাটালেও বিকেলে শোবার পর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই। হঠাৎ ঘুম ভাঙল কলিংবেলের শব্দে। অনবরত কেউ কলিংবেল চাপছে। ঘুম ভাঙার পর বিরক্ত বোধ করল নাবিলা। এই অসময়ে আবার কে? উঠে কাপড়টা ঠিক করে দরজা খুলল। সামনে যাকে দেখল, তাকে দেখে চমকাবার কথা কিন্তু একটুও চমকালো না। ফ্যাকাসে দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পথ থেকে সরে দাঁড়াল।

লাগেজ হাতে ঘরে ঢুকল উল্লাস। চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা। কারো মুখে কোনো কথা নেই। উল্লাস সরাসরি তাকাল নাবিলার দিকে। নাবিলা চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল কি?

– এসবের কী মানে? সরাসরি জানতে চাইল উল্লাস।

– কী?

– তুমি আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করছো না। ফেসবুক, ইমো, ফোন- সব বন্ধ।

– ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি। তোমার পছন্দের খাবার করে রেখেছি।

– হোয়াট? তুমি কি জানতে নাকি আমি আসব?

– বেডরুমে চলো। কাপড় ছাড়ো। ফ্রেশ হও। তুমি অনেক টায়ার্ড।

– তুমি আমার কথার জবাব দাও নাবিলা। প্লিজ।

নাবিলা মর্মাহত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল উল্লাসের দিকে। তারপর বলল, তোমার লজ্জাও করে না, এখন এসে কারণ জানতে চাও। কেমন পুরুষ মানুষ তুমি। একসপ্তাহের জন্য ঘরে স্ত্রীকে একা এক পুরুষের কাছে দিয়ে নিশ্চিন্তে চলে যাও। তোমার কি মনে হয়নি সেই পুরুষ দ্বারা তোমার স্ত্রীর কোনো অসম্মান হতে পারে? পৃথিবীর কোনো স্বামী কি তার স্ত্রীর কাছে এভাবে একা ফ্ল্যাটে দায়িত্ব দিয়ে যায়?

উল্লাস হা করে তাকিয়ে থেকে বলল, তাই তুমি লিখেছো ভারপ্রাপ্ত স্বামী?

– তাইতো। তুমি যেভাবে রেখে গেছো, তাতে সেই অর্থই তো দাঁড়ায়।

– সরি, নাবিলা। এটা আমি নেপাল পৌঁছার পরে বুঝেছি। আমি বড় ভুল করে ফেলেছি। তাই টিকতে না পেরে কাজ ফেলে ছুটে এলাম তোমার কাছে। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও।

উল্লাস নাবিলাকে জড়িয়ে ধরে। উল্লাসের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল নাবিলা। উল্লাস বাঁধা দিল না। আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

আপনার মন্তব্য দিন