রাজনৈতিক দলে রোহিঙ্গা

  • অনেকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন ॥ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মিয়ানমারের নাগরিক- তার পিতা উপজেলার নেতা

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥

বাংলাদেশী পুরুষ বিয়ে করে রোহিঙ্গা নারীরা যেমন জাতীয় সনদ হাতিয়ে নিয়ে এদেশের নাগরিক দাবি করছে, তেমনি রোহিঙ্গা পুরুষরাও বাংলাদেশী নারী বিয়ে করে আত্মীয়তার বন্ধনে বহু জাতীয় সনদ হাতিয়ে নিয়েছে। এমনকি এনআইডি হাতিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজার এবং বান্দরবান জেলায় একাধিক রাজনৈতিক দলে বহু রোহিঙ্গা অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। তৃণমূল কর্মী থেকে টাকার জোরে সভাপতি পদ পর্যন্ত ভাগিয়ে নিয়েছে রোহিঙ্গারা।

জানা যায়, একটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সভাপতি মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা। তার পিতাও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, ওই পরিবারের দুই রোহিঙ্গা নারী পরিচয় গোপন রেখে সরকারী চাকরি করে (শিক্ষিকা) প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা কামাই করছে। রোহিঙ্গা রমনীরা স্থানীয় যুবকদের বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জাতীয় সনদ হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। অনুরূপভাবে বাংলাদেশী যুবক বিয়ে করে রোহিঙ্গা আয়েশার হাতে এখন বাংলাদেশী এনআইডি কার্ড শোভা পাচ্ছে। প্রশাসনের কড়াকড়ি সত্ত্বেও রোহিঙ্গারা কৌশলে বিভিন্ন উপজেলা থেকে ভোটার হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি বুধবার টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে জানা যায়, মোঃ ইলিয়াছ ও রহিমা খাতুনের মেয়ে আয়েশা আক্তার একজন রোহিঙ্গা নারী। টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকে। সেখানে সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করছে। তার কাছে ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গা হিসেবে নিয়মানুসারে ফ্যামিলি কার্ডও রয়েছে।

আবার টেকনাফের হ্নীলা আলী আকবর পাড়া ডেইলপাড়ার মৃত আবুল কাসেম ও রমিজা খাতুনের পুত্র নুর আলমকে বিয়ে করেছে। রোহিঙ্গা আয়েশা আক্তার চট্টগ্রামের সাতবাড়িয়া ২নং ওয়ার্ড থেকে বাংলাদেশী হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেছে। এনআইডি নং-১৯৯৭১৫১১৮৯৫০০০৪১২, ফরম নং-৬১০১১৪৫৫, ভোটার নং-১৫২২৭৩০০০৬৪১, ভোটার ক্রমিক নং- ৮২৫। আইডি কার্ড অনুসারে জন্ম তারিখ ২০ অক্টোবর ১৯৯৭ ইংরেজী। শুধু রোহিঙ্গা আয়েশা একা নয়, পরিবারের আরও ৭ রোহিঙ্গা আত্মীয়-স্বজন একই ঠিকানা ব্যবহার করে জাতীয় সনদ হাতিয়ে নিয়েছে।

তারা জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশী নাগরিক দাবি করতে আইডি কার্ড বানিয়েছে। এসব আইডি কার্ড নকল বা ভুয়াও নয়। অনলাইন ভেরিফিকেশনেও অরিজিনাল হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, বাংলাদেশী যুবক বিয়ে করার পরও রোহিঙ্গা নারী আয়েশা আক্তার আশ্রয় ক্যাম্পে বসবাস করত। বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে আসার পরবর্তী টেকনাফের হ্নীলা আলী আকবর পাড়ার ডেইলপাড়ার স্বামীর বাড়িতে চলে আসে। এ নিয়ে এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শহরের ৭নং ওয়ার্ডে একজন বিএনপি নেতার ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত জিয়ানগর ও হালিমাপাড়ায় অন্তত সাত শতাধিক রোহিঙ্গা ভোটার তালিকাভুক্ত হয়ে জাতীয় সনদ হাতে পেয়ে বাংলাদেশী নাগরিক দাবি করছে।

পুরনো রোহিঙ্গা শামসুল আলম প্রকাশ চনা শামশু। ফিশারিঘাটের সামনে তার চনা মুডির দোকান থাকলেও রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নিয়ে ওই রোহিঙ্গা বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক। ভুয়া ঠিকানায় বানিয়েছেন এনআইডি। তিনি এখন কক্সবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক লীগের সভাপতি। এই বার্মাইয়া শামশু প্রথমে মহেশখালীর বাসিন্দা বলে পরিচয় দিতেন। ক্যাম্পে আশ্রিত প্রভাবশালী রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিভিন্ন উপজেলা থেকে বহু রোহিঙ্গাকে জাতীয় সনদ পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। অনেক রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বক্তব্য নিতে মুঠোফোনে কল করলে প্রথমে রিসিভ করলেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেন শামশু আলম। তবে রোহিঙ্গা কি না সঠিক বলতে পারবনা দাবি করে সেক্রেটারি মোঃ সেলিম জনকণ্ঠকে বলেন, জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় সনদ আছে বিধায় শামশুল আলম আমাদের কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। স্থানীয়রা বলেন, যে দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন থাকে, স্বার্থপরায়ণ রোহিঙ্গারা ওই রাজনৈতিক দলে অন্তর্ভুক্ত হতে জোর তদ্বির চালিয়ে যায়। এদিকে আবু তাহের নামে এক রোহিঙ্গা কলাতলির ডলফিন মোড়ের একটু ভেতরে শালিকা রেস্তরাঁ পরিচালনা করছে। সে বাংলাবাজারের ঠিকানায় এনআইডি তৈরি করেছে। পিতা-পুত্র রেস্তরাঁ ব্যবসার পাশাপাশি বাংলাদেশীসহ অনেক রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়া পাচার করেছে। তার বউ রয়েছে তিনটি। দুই বউ থাকে আশ্রয় ক্যাম্পে ও একজন ইলিয়াছের ভাড়া বাসায়। নূরুল হক ওরফে নূরু বাবুর্চি। সুগন্ধা পয়েন্টে বৃষ্টি রেস্তরাঁর বাবুর্চি হিসেবে চাকরি করছে। এই রোহিঙ্গার দুই ভাই সৈয়দ ও তাহের কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গা হিসেবে সব রকমের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। সে জাতীয় শ্রমিক লীগের নেতা পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব খাটায়। মোহাম্মদ আমিন ওরফে আমিন বাবুর্চি ৪টি বউয়ের মধ্যে এক বউ মহেশখালীর নারী। তার পরিবারের অন্য সকল সদস্য বালুখালী ক্যাম্পে থাকে। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে থাকে কলাতলি সৈকতপাড়া ভাড়া বাসায়। সে মহেশখালীর শ্বশুরালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করে আইডি কার্ড বানিয়েছে। মোহাম্মদ সৈয়দ চালায় ডায়মন্ড হোটেল। থাকে শহরের সমিতি পাড়ায়। চট্টগ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করে এনআইডি হাতিয়ে নিয়েছে।

মোহাম্মদ ইয়াছিন বাগদাদিয়া হোটেলের ব্যবসা করত। সে ভুয়া আইডি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত-বর্তমানে কারাগারে আছে। তার সিন্ডিকেটে আমিন তাহের শামসু সৈয়দ জড়িত বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। জালাল বার্মাইয়া খোরশেদের ভাই। সে খোরশেদের ইয়াবা ব্যবসা দেখাশোনা করে ফাতের ঘোনার জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছে।

জাহাঙ্গীর নুরু চটপটি দোকানের মালিক। একজন রোহিঙ্গা হয়ে প্রধান সড়কের পাশে (ঢাকা ব্যাংক লাগোয়া) প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে স্থানীয় কতিপয় পাতি নেতার সহযোগিতায় ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অঢেল সম্পদের মালিক রোহিঙ্গা জাহাঙ্গীর সমিতি পাড়ায় বসবাস করছে। তার দোকানে নিয়োজিত ১৬ কর্মচারী সবাই রোহিঙ্গা। তাছাড়া বানু রেস্তরাঁয় মোহাম্মদ সেলিম পুরাতন রোহিঙ্গা। তিনি শ্রমিক লীগের শহর শাখার সভাপতি। তার দোকানের সকল বয়বেয়ারাও রোহিঙ্গা। প্রভাবশালী এ রোহিঙ্গার বিচরণ রয়েছে কিছু কিছু দফতরেও। শহরের প্রায় রেস্তরাঁয় শতকরা ৫০ ভাগ রোহিঙ্গা শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। ১২নং ওয়ার্ডের শ্রমিক লীগের সভাপতি নূরুল ইসলাম একজন রোহিঙ্গা। কলাতলির ঝিরঝিরি কুয়া এলাকায় বসবাস করে এ রোহিঙ্গার পরিবার। শহরের পর্যটন এলাকা হলিডে মোড়ে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিক রোহিঙ্গা পুতুর মালিকানাধীন একটি তারকামানের আবাসিক হোটেলও রয়েছে।

উৎসঃ জনকন্ঠ

আপনার মন্তব্য দিন