সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমলে নেয়া প্রয়োজন

মানুষের পৃথিবীতে মানুষই যখন ‘সংখ্যালঘু’ অভিধা পায়, তখন হোয়াইট হাউজ, ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিয়া সাহা এবং তার বক্তব্য- সবই বড় অর্থহীন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি সারা দেশ তোলপাড় করে তুলেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এর অন্যতম একজন সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহার একটি বক্তব্য।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার ব্যাপারে তার অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে সারা দেশ হতবাক হয়ে গেছে, খোদ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এর সভাপতিও বলছেন যে প্রিয়া সাহার বক্তব্য একান্তই তার নিজস্ব। ভিনদেশী প্রেসিডেন্টের কাছে নালিশের সুরে দেশের বিপক্ষে প্রিয়া সাহার নেতিবাচক বক্তব্য উপস্থাপন রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে কি-না, বা এটি ন্যায়সঙ্গত কি-না, সেসব দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনার বিষয়। এখানে প্রধান বিবেচ্য হচ্ছে তার উপস্থাপিত বক্তব্য সঠিকতার বিচারে উত্তীর্ণ কি-না এবং দেশের বর্তমান সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্নে সেটি গ্রহণযোগ্য কি-না।

দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা বর্তমানে কেমন পরিস্থিতির মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে, তা বিবেচনার আগে এ ভূখণ্ডে গত আট দশকে সংখ্যালঘু মানুষের সংখ্যা কোন দিক নির্দেশ করে- দেখা যাক।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ১৯৪১ সালে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ ছিলেন মোট জনসংখ্যার ৭০.৩ শতাংশ, হিন্দুসহ অমুসলিম ছিলেন ২৯.৭ শতাংশ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে প্রথম আদমশুমারিতে দেখা যায়, অমুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল মোট জনসংখ্যার ১৪.৬ শতাংশ, যা ২০১১ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯.৬১ শতাংশে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (রিপোর্ট) এর তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে কমপক্ষে নয় লাখ হিন্দু দেশ ত্যাগ করেছেন।

অপর একটি তথ্যসূত্র বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের কমপক্ষে ১৫টি জেলায় হিন্দুদের সংখ্যা কমেছে। তাঁরা নিজ জেলা ছেড়ে অন্য কোথাও গেছেন এমন কোনো প্রমাণ নেই। এদেরকে বলা হচ্ছে ‘মিসিং পপুলেশন’।

এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব বলছে, যেসব জেলায় এক সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাধিক্য ছিল, যেমন- গোপালগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঠাকুরগাঁও, খুলনা, দিনাজপুর ও বাগেরহাট, এসব জেলায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। কেবল নড়াইল ব্যতীত অন্য সকল জেলায় ১৯৯১ সালের পর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কমেছে। এসব তথ্য-উপাত্ত থেকে এ কথা তো পরিষ্কার যে দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।

গত কয়েক দশকে এ বিশাল পরিমাণে সংখ্যালঘু জনসংখ্যার হ্রাস এটাই প্রমাণ করে যে দেশে কোনো না কোনোভাবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণ সংঘটিত হচ্ছে। যদিও অনেকেই মনে করেন যে দেশান্তর হওয়া অমুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশ নির্যাতন বা নিরাপত্তার অভাবের কারণে নয়, বরং স্বেচ্ছায় বা জীবিকার উদ্দেশ্যে অথবা শেকড়ের টানে দেশ ছেড়েছেন৷ এ কথা গ্রহণযোগ্য হলেও এ সংখ্যাটি যে নগণ্য তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সুতরাং দেশে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা হ্রাসের উল্লেখযোগ্য হার এবং এর অন্যতম কারণ হিসেবে নির্যাতন ও অনিরাপত্তার ব্যাপারটি আমাদের অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০১ সাল-পরবর্তী ১৩ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২০ হাজারেরও বেশি। সর্বশেষ ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চার বছরে দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৩৫৩১টি৷ চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই এসব ঘটনার সংখ্যা আড়াইশো ছাড়িয়েছে।

সুতরাং প্রিয়া সাহার বক্তব্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এর সত্যাসত্যের বিষয়টিকে সরিয়ে রাখলেও সংখ্যালঘু-নিরাপত্তার ব্যাপারটি আমাদের ভাবনায় নতুনভাবে স্থিত করার এবং এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার পথ উন্মুক্তকরণের দিক থেকে এটি অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে- সন্দেহ নেই। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে বলা তার বক্তব্যকে আমরা গ্রহণ করি বা না করি, সে বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে যতটুকু সমস্যা চিহ্নিত হবার অবকাশ তৈরি হয়েছে, তা সমাধানে সচেষ্ট হওয়াটাই এ মুহূর্তে প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।

আপনার মন্তব্য দিন