স্বপ্নে ইউরোপ, বাস্তবে সাগরে ভাসা

রাফি আহমদ দেওয়ান:-

ইউরোপের বাসিন্দা হতে হাজার মাইল দূরের ভূমধ্যসাগরের পথ পাড়ি দিচ্ছেন বাংলাদেশিরা। এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে বেশ বড় অঙ্কের অর্থও দিতে হয় দালালদের।

বাংলাদেশ থেকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, কাতার, তিউনিসিয়া হয়ে লিবিয়া পাঠানো হয় অভিবাসন প্রত্যাশীদের। প্রায় পাঁচ মাস তাদের লিবিয়ায় রাখা হয়। পরে অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের ছোট ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হয় ইতালির পথে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার সময় নৌকায় ধারণসংখ্যার তুলনার অধিক মানুষ চাপিয়ে দেয়া হয়। এতে প্রায়ই ঘটে নৌকাডুবির ঘটনা ও প্রাণহানি।

অনেক ভাগ্যবান সাগর পাড়ি দিতে সক্ষম হলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই দালালের খপ্পরে পড়েন। দালালরা তাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে।

ভূমধ্যসাগরে তিউনিসিয়া উপকূলে আটকে পড়া ৬৪ বাংলাদেশি মঙ্গলবার (১৮ জুন) দেশে ফিরতে রাজি হয়েছেন। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তারা একটি নৌকায় তিউনিসিয়ার জলসীমায় আটকে ছিলেন। লিবিয়া থেকে তারা ইউরোপের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

শুক্রবার (২১ জুন) বিকাল সোয়া ৫টায় কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান অভিবাসন প্রত্যাশীরা। এরপর কিছু প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দর ত্যাগ করেন তারা।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য মতে, ১৭ জনের মধ্যে আটজনের বাড়ি মাদারীপুর, চারজনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আর পাঁচজনের বাড়ি মৌলভীবাজার নোয়াখালী, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ ও শরীয়তপুরে।

রেডক্রিসেন্টের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তিউনিসিয়ার সাগরে একটি নৌকায় ভাসছিলেন ৭৫ জন অভিবাসন প্রত্যাশী, যাদের মধ্যে ৬৪ জনই বাংলাদেশি। নৌকাটি তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছালেও কর্তৃপক্ষ তীরে নামার অনুমতি দেয়নি।

তিউনিসিয়া কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের শরণার্থী কেন্দ্রে নতুন করে কাউকে জায়গা দেওয়া সম্ভব না। ফলে ওই নৌকাটি উপকূলীয় জারজিস শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে সাগরে ভাসতে থাকে।

লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানায়, আটকে পড়া বাংলাদেশিরা দেশে ফিরে যাবেন- দূতাবাসের পক্ষ থেকে তিউনিসিয়ার কর্তৃপক্ষকে এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গত ১৮ জুন সন্ধ্যায় জারজিস বন্দরে তাদের নামার অনুমতি দেয়। তবে তারা থাকার অনুমতি দেয়নি।

কঠোর নজরদারিতে তাদের রেড ক্রিসেন্ট ও আইওএম পরিচালিত শেল্টার হাউজে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে সবাইকে দেশে পাঠানো হয়। প্রথম দফায় ২০ জনকে টিকিট দিলেও তিনজন আসতে রাজি হননি। বাকি ১৭ জন ঢাকায় আসেন।

গত মে মাসের ১০ তারিখে অবৈধ পথে ইতালি পাড়ি দিতে গিয়ে তিউনিসিয়া উপকূলে  নৌকাডুবিতেতে প্রাণ হারায় প্রায় ৭০ জন। যাদের মধ্যে বাংলাদেশি ৬৬ জন। যারা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। তারা এখন দেশে ফিরতে শুরু করেছেন।

তেমনি একজন বিলাল আহমদ।  তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মউদপুর গ্রামের মৃত তজম্মুল আলীর ছেলে। ৩ সপ্তাহ আগে দেশে ফিরেছেন তিনি।

লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি থেকে বেঁচে ফেরার রোমহর্ষক বর্ণনা দিতে গিয়ে বিলাল আহমদে জানান, নিজে বেঁচে ফিরলেও চোখের সামনে আপন ভাগ্নে আহমদ হোসেন, দুই ভাতিজা আব্দুল আজিজ ও লিটন আহমেদ সাগরে ডুবে মরতে দেখেছেন। ১১ ঘণ্টা সাগরের পানিতে ভেসে থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বিলাল।

তিনি বলেন, লিবিয়ায় জিম্মি করে কয়েক মাস চলে নির্যাতন। পাসপোর্ট ছিনিয়ে নিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় দেশে ফিরে আসার পথও। অবশেষে প্রতিজনের পরিবারের কাছ থেকে চুক্তির ৮ লাখ টাকা আদায়ের পর আরও কয়েক লাখ টাকা আদায় করে ইতালির উদ্দেশে তাদের তুলে দেয়া হয় রাবারের নৌকায়। অল্পদূরে গিয়েই ডুবে যায় তাদের বহনকারী নৌকাটি।

বিলাল কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, লিবিয়ায় আরও অন্তত ২শ বাংলাদেশি তরুণকে এই পথে ইতালি পাঠাতে জড়ো করে রেখেছে পাচারকারী চক্র। অতিরিক্ত টাকার জন্য চালাচ্ছে নির্যাতন। তারা ইতালিতে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে লিবিয়ার দালালদের কাছে তাদের বিক্রি করছে।

গত ১৭ মে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে বাংলাদেশি প্রাণহানির ঘটনায় জড়িত পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

গ্রেফতারকৃতদের বর্ণনা করতে গিয়ে র‍্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, এ চক্রের টার্গেট অল্প শিক্ষিত লোক। কয়েকটি এজেন্সির সদস্যরা গ্রামে গ্রামে অল্প শিক্ষিতদের খুঁজে বের করেন। তারা আট লাখ টাকায় ইউরোপে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, একইসঙ্গে বেশি বেতনের লোভ দেখানো হয়। এরা ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে দুই ধাপে টাকাগুলো নেয়। প্রথম ধাপে লিবিয়া যাওয়ার আগে ৫ লাখ, লিবিয়ায় যাওয়ার পর ৩ লাখ টাকা।

কেন ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন বাংলাদেশিরা? 

লিবিয়ায় ২০১০ সালের দিকে প্রচুর বাংলাদেশি কাজ করত। ওই সময় লিবিয়াতে যুদ্ধ শুরু হলে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষ বাংলাদেশে ফিরে যান। তবে এর মধ্যে একটা বড় অংশ যারা ফিরতে পারেননি। তখন তারা  কোনো উপায় না পেয়ে  ইউরোপ ঢোকার চেষ্টা করে।  সে সময় থেকেই ওই পথটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে এই পথটি বেছে নিয়ে গড়ে ওঠে মানবপাচার চক্র।  বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া তারপর ইউরোপ নিয়ে যায় চক্রটি। ২০১০ সাল থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত এই ঝুঁকি নিচ্ছে তারা।

লিবিয়ার সর্ব পশ্চিমের উপকূল থেকে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপে যেতে সমুদ্রপথে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৩০০ মাইল। আর এই সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে পাচারকারীরা গাদাগাদি করে ছোট নৌকা ব্যবহার করে। এসব নৌকা বাতাস দিয়ে ফুলানো ডিঙিতে করে অভিবাসীদের বেশ কিছুটা পথ নিয়ে যান। আর এতেই ঘটে দুর্ঘটনা।

আইওএমের ২০১৭ সালে একটি জরিপে তথ্যমতে, যেসব দেশের নাগরিক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছে সেসব দেশের প্রথম পাঁচটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ।

এ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান বিষয়ক পরিদপ্তর ইওরোস্ট্যাটের জরিপে দেখা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যেসব দেশের নাগরিকেরা ইউরোপে সবচেয়ে বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করেছে সে রকম প্রথম দশটি দেশের তালিকাতেও বাংলাদেশ রয়েছে।

সরকারিভাবে বারবার সতর্ক করার পরেও নিজেদের ভাগ্য বদল ও পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। পা দেন দালালের ফাঁদে।  বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েও দালালদের হাত থেকে রক্ষা পান না সেসব দূর্ভাগা তরুণরা। দালালরা কতটা নৃশংস হতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশের জঙ্গলে গণকবর আবিষ্কৃত হওয়ার পর।

আপনার মন্তব্য দিন