হারানো আর প্রাপ্তির মিলনমেলা-২০১৯

।। শাহজাহান চৌধুরী শাহীন ।।

হাকালের পরিক্রমায় প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম মেনে পুরোনো বছর শেষে নতুন বছর আসে। কিন্তু গেল বছরটা আমার জীবনের জন্য ছিল ঘটনাবহুল। বিদায়ী বছরে আমি হারিয়েছি পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ডাক ‘মা’। আর হারিয়েছি এক ভাই। নতুন বছরের প্রাক্কালে ফিরে দেখছি ২০১৯ সালের চির ভাস্বর হয়ে থাকা ঘটনাগুলো।

২০১৯ সালটি নিয়েছে বিদায়। এই গেল বছরে আমি হারালাম কত কিছু , পেলামও অনেক। ব্যক্তিগত দিক থেকে বলতে গেলে এই গেল বছরটি ছিল অনেক ঘটনাবহুল।

সেই ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর। পৃথিবীর বর্ষপরিক্রমায় যুক্ত হলো আরেকটি পালক। নতুন একটি বর্ষে পদার্পণ করল এই অধরা। দিনে দিনে বর্ষ শেষ হয়ে এলো। ইতিহাসের পাতায় নথিভুক্ত হলো আরও একটি বছর ২০১৯। সম্ভাবনার অপার বারতা নিয়ে শুরু হলো নতুন বছর। স্বাগত ইংরেজি নববর্ষ, স্বাগত ২০১৯। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে ভূমিষ্ঠ হলো নতুন একটি বছর। পুরনো একটি বছরকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দুরন্ত আহ্বানে স্বাগত জানালাম অনাগত ভবিষ্যৎকে। গেল বছরের শুরুটা ছিল অনেক উৎসাহ, উদ্দিপনা আর আনন্দের। কিন্তু সেটি বেশি দিন ঠিকেনি।

গেল বছর ৪ মার্চ ২০১৯ সোমবার আমার মেঝ ভাই আলহাজ্ব এইচএম নুরুল আজিম মারা যান। তিনি  ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে  চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর।

হারানোর পাশাপাশি কিছু প্রাপ্তিও ছিল। তবে তা ছিল প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি অনেক কম। দীর্ঘদিন কাজ করে আসা অনেক পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিদায় নিয়েছিলাম এই বছরই। ২০১৯ সালে ঢাকার জাতীয় দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদে এবং ন্যাশনাল ইংরেজী দৈনিক দ্য ডেইলি ট্রাইব্যুনালে কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিলাম।

আর এই বছর কক্সবাজার ক্রাইম নিউজ এর বার্তা সম্পাদক হলাম এবং বিজয়ের মাসে বিবিসি বাংলাদেশ ডটকম এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হলাম। এগুলো ছাড়াও অনেক অনেক কিছু প্রাপ্তি ছিল গেল বছর ২০১৯ সালে।

অক্টোবর মাসে একটি অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনায় জীবন মুত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়ে গেলাম। নভেম্বর মাসে আমার শরীরে অস্ত্রোপচার হলো। দীর্ঘ একটি মাস হাসপাতালের বিচানায় পড়ে রইলাম।এখনো সেই অসুস্থতা কেটে উঠেনি। মা হারানোর বেদনাও বয়ে বেড়াচ্ছি।

১৬ ডিসেম্বর আমার জীবনের সব চেয়ে প্রিয়, আমার মাকে হারালাম। কতদিন মা বলে ডাকি না। মায়ের স্পর্শ পেতে, মাকে ছুয়ে দেখতে খুব ইচ্ছে করে। মাকে খুব মনে পড়ে, প্রতিটি মুহুর্তে।  মা” পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ডাক।  মা কি জিনিষ, মাকে হারিয়ে বুঝতে শিখেছি।

  • ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সম্পদটি হারিয়ে বুঝতে পারলাম আনেক বড় কিছু হারিয়ে ফেলেছি আমার জীবন থেকে।  আমি কেমন যেন অস্বাভাবিক হয়েগেছি। সেখান থেকে নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আমার আরো কতো বছর সময় লাগবে, আল্লাহই জানেন।মা মারা গেছেন ২০১৯ সালে ১৬ ডিসেম্বর সোমবার।“নিজেই কবরে নেমে মার শরীর আঁকড়ে ধরে শুইয়ে দিয়েছি বাবার পাশে কবরে’’।
    এক একটা সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা,দিন আর সপ্তাহ পেরিয়ে ১৭টা দিন চলে গেলো। এভাবে সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে যাবে বছর। তবু অন্তর জুড়ে রয়েছেন পরম মমতায়। মায়ের ভালোবাসা তখন যতটা না বুঝেছি, এখন তার চেয়ে বেশি বুঝি।  কিন্তু আফসোস আর তো মাকে ফিরে পাই না। শুধু মনে হয় একবার যদি সেই সময়টা ফিরে পেতাম…………..।

মাকে ভালোবাসুন, বাবাকেও ভালোবাসুন এবং সেটি সব সময়! কখনো কখনো সুযোগ পেলে তার প্রকাশও করুন। আপনাকে পৃথিবীতে যিনি এনেছেন, তাদের বুঝতে দিন যে তারা আপনার কাছে বিশেষতম ব্যক্তিত্ব! আর আমার মত দুর্ভাগারা, যখন স্মরণে আসে তখনি বাবা-মায়ের জন্য প্রার্থনারত থাকুন। হারিয়ে গেলেই বুঝবেন কি অমূল্য সম্পদ আপনি হারালেন! আপনার ভেতরটা গুমরে গুমরে কাঁদবে, কিন্তু মাথা রাখার সেই কোমল কাঁধ আর খুঁজে পাবেন না! বাবা-মায়েরা ভালো থাকুন এপারে, ভালো থাকুন ওপারেও…

এই গেল বছর অনেক প্রত্যাশা ছিল,কিন্তু প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে ছিল বিস্ত ফারাক। তবে এই বছর আমাকে অনেক দিলেও কেড়েও নিয়েছে অনেক কিছু। এভাবেই কেটে গেল ২০১৯ -কিছু পেলাম,কিছু হারালাম। সব মিলিয়ে জীবন থেকে ঝরে গেল একটি বছর। যুক্ত হলো ২০২০ সাল। শুধু সঞ্চয় হয়ে রইলো স্মৃতি-বিস্মৃতিগুলো।

সেইসাথে পেয়েছি অনেক নতুন মানুষের দেখা যারা বন্ধু হয়ে,বোন্ হয়ে এবং ভাই হয়ে এসেছে আমার জীবনে। সবার মাধ্যমে পেয়েছি না জানি কত জন্মের কত আত্মার আত্মীয়র দেখা। আবার হারিয়েও গেছে কেউ কেউ যারা একসময়ে ছিল খুব কাছের। জীবন যে হারানো আর পাওয়ার মিলনমেলা।

এভাবেই কেটে যাবে আরও কিছু বছর আরও কিছু হারানো আর প্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে। তারপর দেখতে দেখতে একদিন এই শরীরটাও যাবে হারিয়ে – অনন্তের ঘরে ফিরে যাব আমরা পরম আনন্দভরে -শুধু খেয়াল রাখতে হবে সেখানে যাওয়ার সময় এই ভবের হাত থেকে কি নিয়ে যেতে পারলাম।

লেখক- শাহজাহান চৌধুরী শাহীন ( সিনিয়র সাংবাদিক)  

 

আপনার মন্তব্য দিন