ইসলামের চাদরে বিজয় দিবসের ভাবনা

মুফতি মোহাম্মদ জাফর
সিনিয়র শিক্ষক:- আল জামেয়া এমদাদিয়া লেঙ্গুরবিল বড় মাদরাসা

আজ মহান বিজয় দিবস। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে আজ আনন্দের মিছিল। ঠিক আজকের এই দিনে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধ করার পরে বিজয় অর্জিত হয়। বিজয় দিবস উদযাপন সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? বিজয় দিবস নিয়ে ইসলামী চিন্তা, মূল্যায়ন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কর্মপন্থা একটু আলাদা এবং একটু ভিন্নতর। এই বিষয়ে আলোকপাত করার পূর্বে বাংলাদেশের বিজয় দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা জরুরী।

ভারতীয় উপমহাদেশ দীর্ঘ আড়াইশ বছর ইংরেজ শাসনের যাতাকলে ছিলো। উপমহাদেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও আলেমদের দীর্ঘ সংগ্রামের পরে ১৯৪৭ সালে জন্ম নেয় দুটি ভূখÐ। একটির নাম ভারত ও অপরটির নাম পাকিস্তান। বাংলাদেশ চলে যায় পাকিস্তানের অধীনে পূর্ব পাকিস্তান নামে। পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীরা বৃটিশদের পরাধীনতার শিকল থেকে বেরিয়ে পাকিস্তানীদের পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ হলো। কারণ পাকিস্তান স্বাধীন হলেও পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীরা স্বাধীনতার স্বাদ পায় নি। পেয়েছে পাকিস্তানীদের থেকে জুলুম ও নির্যাতন । সেই জুলুম অত্যাচারে নিস্পেষিত হয়ে বাংলাভাষীদের অন্তরে  জাগরিত হলো প্রকৃত স্বাধীনতার আওয়াজ। সেই আওয়াজে প্রথম রাজপথে কম্পিত হয়েছিলো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারী।

বাংলা ভাষার আন্দোলনে ঢাকার রাজপথ হয়েছিলো মানুষ আর মানুষের মিছিলে। সেই মিছিলে পাকিস্তানী স্বৈরাচারী শাসক এলোপাতারি গুলি করে। শহিদ হয়েছিলো রফিক, বরকত, জব্বার ও নাম না জানা অনেকেই। মনে রাখতে হবে সেই দিন হতেই আমাদের বিজয় দিবসের বীজ বোনা হয়েছিলো।

সেই ভাষা আন্দোলনের পরে পূর্ব পাকিস্তানীদের ওপরে নির্যাতনের স্টিম রোলার আরো বেড়ে যায়। যতই জুলুম ও নির্যাতন করা হোক না কেন বাঙ্গালীর হৃদয়ে আছে চূড়ান্ত স্বাধীনতা ও বিজয়ের তামান্না। তাই ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ৬দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যূত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ।  ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের ওপর পাকিস্তানীদের অতর্কিত আক্রমণ ও গোলাবারুদ বর্ষণ। নিরস্ত্র বাঙ্গালী সাথে সাথেই বুকে সাহস নিয়ে চূড়ান্ত বিজয়ের আশায় যার যা কিছু ছিলো তা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে পাকিস্তানীদের ওপর। দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে বাংলার আকাশে উদিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। আমরা পেলাম লাল সবুজের পতাকা। আমাদের পতাকায় লুকিয়ে আছে স্বাধীনতার ইতিহাস। আমাদের পতাকায় লাল বৃত্তের অর্থ হলো, এই দেশ রক্তের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে এবং আমাদের পতাকায় সবুজ অর্থ হলো, এই বাংলার নয়নাভিরাম সবুজ শ্যামল প্রকৃতি। বাংলার এই ইতিহাসে একটি কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, এই বিজয় হঠাৎ করে আসে নি; ধীরে ধীরে অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে। সুতরাং আমাদের উচিত, মুসলমান হিসেবে এই বিজয় উদযাপনে ইসলামের রূপরেখা ও কর্মপন্থা কী তা জানা।

বিজয় দিবস নিয়ে ইসলামে কোন বিরোধীতা নেই বরং দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও বিজয় উদযাপন উপলক্ষে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা , শুকরিয়া ও তারই কাছে কাছে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ রয়েছে। বলা হয়, দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।  সুতরাং পরাধীনতার কবল থেকে বেরিয়ে বিজয় অর্জন একইসূত্রে গাঁথা। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা. মক্কা বিজয়ের পর আনন্দ উদযাপন করেছেন। সেই আনন্দ উদযাপন ছিলো ৮ রাকাত নফল নামাজ পড়ে এবং ক্ষমা প্রর্দশনের মাধ্যমে। ম্ক্কা বিজয়ের দিন রাসুল সা. এতো বেশি খুশি হয়েছিলেন যা কলমের কালিতে ও মুখের আওয়াজে বোঝানো অসম্ভব। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল সা. ঘোষণা করেছিলেন, যারা কা’বা ঘরে আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ। এভাবে মক্কার কয়েকটি স¤ভ্রান্ত পরিবারের নাম উল্লেখ করে বলেন, যারা এদের ঘরে আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ।  এই ছিলো রাসুলের বিজয়ের আনন্দ ও বিজয় উদযাপন।

পবিত্র কোরআনে বিজয় দিবস নিয়ে দু’টি বর্ণনা আছে। এক. সূরা নামলের ৩৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, রাজা বাদশা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে তখন তা বিপর্যস্ত করে এবং সেখানকার মার্যাদাবান লোকদের অপদস্থ করে। দুই. সূরা হজে¦র ৪১ নং আয়াতে  আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি এদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে এরা সালাত আদায় করবে, যাকাত দান করবে এবং সৎ কাজের আদেশ করবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। উল্লিখিত দুইটি বর্ণনায় প্রথমটি হলো সৈরাচারী শাসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ও অপরটি হলো ন্যয়পরায়ণ শাসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং আমাদের উচিত, এমনভাবে বিজয় উদযাপন করা, যাতে ইহকালেও যেমন সম্মনিত হবো তেমনি পরকালেও যেনো সম্মনিত হই।

ন্যায় পরায়ণ শাসক ও বিজয়ীদের উদযাপন নিয়ে সূরা নাসর-এ মহান আল্লাহ তায়ালা খুব সুন্দর করে বলেছেন, এই সূরাতে বিজয় উদযাপন নিয়ে তিনটি শিক্ষা আমরা পাই, এক. ’ফাসাব্বিহ’ তথা আল্লাহর বড়ত্ব ও পবিত্রতা বর্ণনা কর। দুই. ’বিহামদি রাব্বিক’ তথা আল্লাহর হামদ ও শুকরিয়া আদায় করা। তিন. ”ওয়াসতাগফির” তথা যুদ্ধের সময়ের ভুল-ভ্রান্তি যা হয়েছে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। বিভিন্ন হাদিস হতে জানা যায়, আট রাকাত নামাজ আদায় করা, মৃতদের ইস্তিগফার ও দোয়া করা এবং পবিত্র পাঠসহ বিভিন্নভাবে ঈসালে সওয়াব করা। সুতরাং উল্লিখিত বর্ণনা হতে বোঝা গেলো, শুকরিয়া ও ক্ষমার মাধ্যমে বিজয় উদযাপন করা। মুসলমানদের উচিত, ইসলামী সংস্কৃতি অনুসরণ করে সকল শহীদদের প্রতি ঈসালে প্রেরণ করে বিজয় উদযাপন করা।

আপনার মন্তব্য দিন