বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন

ইয়াবাসক্ত স্বামীর অত্যাচারে কপাল পুড়েছে নববধু আছিয়ার!

নিউজ কক্সবাজার ডটকম
  • আপডেট টাইম বুধবার, ১১ নভেম্বর, ২০২০
বেলাল আজাদ।।
দরিদ্র হলেও অত্যন্ত সৎ, সহজ-সরল, পরহেজগার মুসলিম যৌথ পরিবারের পর্দানশীন, মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনাসহ কুরআন-হাদিস পড়া ও নামাজী আছিয়া খাতুন। এই আছিয়ার দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই এমন কঠোর বিপর্যয় নেমে আসবে, তা তার নিজের বা পরিবারের কারও ভাবনায় ছিল না। বিয়ের পরপরই নববধু আছিয়া বুঝতে পারেন, তার স্বামী মাদকাসক্ত! সে ইয়াবা সেবনে আসক্ত। প্রায় সময় ইয়াবা সেবন করে অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ আর লাগামহীন শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার দিন দিন বেড়েই চলে। বিয়ের মাস না পেরুতেই পিত্রালয় থেকে বিয়ের সময় দেওয়া আসবাবপত্র-স্বর্ণালংকার একে একে বিক্রি-আত্মসাৎ এবং তাকে প্রতি মুহূর্তেই মারধর করতেই থাকে।
মাস পার হতেই বেশ কয়েকবার স্থানীয় ভাবে ও থানায় বৈঠকে সালিশ-বিচার, বৈঠক হয়। ইতিমধ্যে একাধিকবার নববধু আছিয়া খাতুনকে মেরে পিত্রালয়ে তাড়ানোও হয়।
স্থানীয় ভাবে ও থানার প্রায় প্রতিটা বৈঠকে ইয়াবাসক্ত হামিদ হোসেন আর এমন করবে না বলে অঙ্গীকারনামা দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না।কিছুতেই স্বভাব না পরিবর্তন করে না, ছাড়ে না ইয়াবা সেবন ও স্ত্রী অত্যাচারী অভ্যাস। প্রতিনিয়ত ইয়াবা সেবন, ঘরের আসবাবপত্র আত্মসাৎ ও স্ত্রী আছিয়া খাতুনকে নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলতে থাকে।
বিয়ের সময় আছিয়ার দরিদ্র পরিবার অতি কষ্টে, অনেক ধার-কর্জ করে কয়েক লাখ টাকার আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, স্বর্ণালংকার এবং অজুহাতের খপ্পরে পড়ে প্রায় ৩ লাখের মত নগদ টাকা যৌতুক দিতে বাধ্য হয়েছিল। তবুও দরিদ্র কিন্তু আদর্শ পরিবারটি চাইছিল, তাদের আদরের ছোট মেয়েটি সুখী হোক। কিন্তু কপাল পোড়া আছিয়া খাতুন সুখী হতে পারেননি, হয়েছেন জনম দুঃখী।
সর্বশেষ গত ২০ আগষ্ট আছিয়া খাতুনের ইয়াবাসক্ত স্বামী হামিদ হোসেন ও তার উশৃংখল পরিবারের সদস্যরা যৌতুক সহ আরও অন্যায় দাবীতে আছিয়া খাতুনকে অমানুষিক নির্যাতন করে ঘর থেকে বের করে দিলে পিত্রালয়ের লোকজন এসে তাকে নিয়ে গিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়ে থানায় অভিযোগ দিলে নানা তালবাহানায় ও পুলিশের দায়সারা ভাবে কোন প্রতিকার না পেয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন, আর মাদকাসক্ত স্বামী অনায়াসে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়! এমতাবস্থায় অনিশ্চিত জীবনের কপাল পুড়ল নববধু আছিয়ার।
কক্সবাজারের বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩য় (টেকনাফ) আমলী আদালতে গত ১ সেপ্টেম্বর দায়ের করা সিআর নং-১৩৬/২০২০ (ধারা: ২০১৮ সনের যৌতুক নিরোধ আইনের ৩) মামলার সুত্র থেকে কপাল পোড়া নববধূ আছিয়া খাতুনের দাম্পত্য সূচনার অমানবিক বিপর্যয়ের করুণ কাহিনী উঠে আসে।
আছিয়া খাতুন (২০) কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ কোনার পাড়ার বাসিন্দা আবদুল আমিনের কন্যা। গত লকডাউন শুরুর আগে ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি সময়ে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাতিরঘোনা মিটাপানির ছরা এলাকার জহির আহমদের ছেলে হামিদ হোসেনের (৩৩) সাথে রেজিঃযুক্ত কাবিননামা মুলে, সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক ভাবে আছিয়া খাতুনের বিয়ে হয়ে। নির্যাতিত নববধু আছিয়া খাতুনের পিতা আবদুল আমিন জানান, বিয়ের পর থেকেই তার মাদকদাসক্ত জামাতা হামিদ হোসেন তার মেয়ের উপর অমানুষিক নির্যাতন ও বিয়ের সময় মেয়েকে দেওয়া আসবাবপত্র, স্বর্ণালংকার বিক্রি-আত্মসাৎ করতে থাকে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এত কষ্টে মেয়ের বিয়ের মাত্র কয়েক মাস না পেরুতেই আমাদের থানা-কোর্টে দৌঁড়াতে হচ্ছে ন্যায় বিচারের আশায়, কিন্তু ন্যায় বিচার বা স্থায়ী সমাধান কোথাও পাইনি। মেয়ের মাদকাসক্ত স্বামী মেয়ের সর্বস্ব আত্মসাৎ করতেই আছে, মেয়ের পরিধেয় কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র ও স্বর্ণালংকার কিছুই ফেরত দেয়নি। উল্টো জামিনে (২৮ অক্টোবর) গিয়ে নানা ভাবে হুমকি দিচ্ছে ও অপমাণ করেই যাচ্ছে।
আদালতের একাধিক বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে আলাপে ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আছিয়া খাতুনের করা (সি.আর-১৩৬/২০২০) মামলায় আসামী ইয়াবাসক্ত হামিদ হোসেন সহসা আর জেল হাজতে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, মামলাটি ইতিমধ্যে বিচার ফাইলে বদলী হয়েছে। মামলায় আসামীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন ও বাদী পক্ষের স্বাক্ষী-প্রমাণ উপস্থাপনে বিচার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ এক বছর বা ততোধিক সময় লাগতে পারে। টেকনাফ সীমান্তের একবারে শেষ প্রান্ত থেকে দীর্ঘ দুরত্বে আদালতে যাতায়াতের ভোগান্তি ছাড়াও বিপুল অর্থ ব্যয় করার মত অবস্থা কপাল পোড়া নববধূ আছিয়া খাতুনের দরিদ্র পিতৃ পরিবারের নাই। তার মাদকাসক্ত স্বামী হামিদ হোসেন কতৃক বিয়ের সময় নেওয়া যৌতুকের কয়েক লাখ টাকা বাদেও আছিয়া খাতুনের পরিধেয় কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র ও স্বর্ণালংকার কিছুই ফেরত দেওয়ার নামগঁন্ধও নাই, এসব ফেরত পাওয়ার মত আইনগত কোন উপায় বা পদক্ষেপও নেই।
নির্যাতিত-নিপীড়িত ও নিঃস্ব আছিয়া খাতুনের আইনজীবী এডভোকেট মুহাম্মদ আবুল কাশেম (এপিপি) ও এডভোকেট জাবেদুল আনোয়ার রুবেল জানান, আছিয়া খাতুনের মামলায় বর্ণিত মর্মান্তিক ঘটনা পর্যালোনায়, এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী নির্মম ঘটনার মামলা। একজন দরিদ্র পিতা ধার-কর্জ, বন্ধঁকে যোগার করে মহা ধুমধামে  ৮/১০ লাখ টাকা খরচ করে মেয়ের সুখের আশায় বিয়ে দিয়ে উল্টো জনম দুঃখই ভাগ্যে লিখেছেন। অভাগী আছিয়া খাতুনের পরিবার যেমন নিঃস্ব, তেমনি অনিশ্চিত জীবনের হাহাকারে। এর চেয়ে দুঃখের কথা একজন নারীর জীবনে আর হতে পারে না।
অভিযুক্ত ইয়াবাসক্ত হামিদ হোসেনের আইনজীবী এডভোকেট মাহবুবুর রহমান (এপিপি) জানান, তার আসামী হামিদ হোসেন গত ২৮ অক্টোবর আছিয়া খাতুনের মামলায় বিজ্ঞ আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে, বিজ্ঞ আদালত আসামীর নিকট হতে লিখিত স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ পূর্বক অন্তবর্তীকালীন জামিনে মুক্তি প্রদান করেছেন। হামিদ হোসেন তার স্ত্রী আছিয়া খাতুনকে নিয়ে দাম্পত্য জীবন-যাপনে বদ্ধপরিকর।
অন্য দিকে আছিয়া খাতুন জানান, তার মাদকাসক্ত স্বামী প্রায় প্রতিদিনই ইয়াবা সেবন করে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, কথায় কথায় (মৌখিক) তিন তালাক  এবং তার আসবাবপত্র ও স্বর্ণালংকার বেচাবিক্রি-আত্মসাৎ করতে থাকে। এরপরেও নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্বামীর অত্যাচার নিরবে সহ্য করে স্বামী কে সুপথে ফেরাতে ও স্বামীর সাথে দাম্পত্যে বসবাসের আপ্রাণ চেষ্টা তিনি করেছেন। কিন্তু তার মাদকাসক্ত, দুর্লোভী ও অত্যাচারী স্বামীর নিপীড়নের মাত্রা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং স্বামীর অত্যাচারেই তাকে পিত্রালয়ের অবস্থান ও আইনের আশ্রয় নিতে হয়। এখন তার মাদকাসক্ত স্বামীর অত্যাচার আরও বেড়ে গেছে।
টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, এই বিষয়ে তার জানা নেই। থানায় ইতিপূর্বে যে অভিযোগ দেওয়া হয়, তখনকার সময়ে তিনি বা বর্তমানের কোন পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন না। এখন অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্ত হামিদ হোসেনের বক্তব্য নিতে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আপনার মন্তব্য দিন

নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো সংবাদ>>
© All rights reserved © 2017-2020 নিউজ কক্সবাজার ডটকম
Theme Customized By Shah Mohammad Robel