কক্সবাজারে জলদস্যু ফারুক ইয়াবা জগতের কিং হয়ে উঠার নেপথ্যে

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন।।

জহিরুল ইসলাম মো. ফারুক। এক সময়ের পোনা ব্যবসায়ী। দাদার বাড়ী চট্টগ্রামে। আর নানার বাড়ী কক্সবাজার শহরে উত্তর নুনিয়াছড়ায়। মা রাজিয়া বেগম রাজু ছিলেন
কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক মহিলা মেম্বার। মুলত মায়ের আস্কারায় ছেলে ফারুক ও কামরুল অপরাধ জগতে পা বাড়ান। শুরু করেন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ। কক্সবাজার পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের উত্তর নুনিয়ারছড়ায় ফারুক ও কামরুল গড়ে তুলেছিল পৃথক বাহিনীও। বঙ্গোপসাগরে দস্যুতা, জেলেদের মাছ, জাল ও ফিশিং ট্রলার লুটের ঘটনায় আটক হয়ে জেলও খাটেন ফারুক। তার ভাই কামরুলও শহরের হলিডের মোড়ে টাকা ছিনতাই করে পালানোর সময় জনতার সহযোগীতায় আটকা পড়ে পুলিশের জালে। পরে অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশের সাথে গোলাগুলির ঘটনায় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী কামরুল। তবে ছেলেরা যত অপরাধই সংগঠিত করতো, সব অপরাধের পৃষ্টপোষকতা দিতেন মা রাজু মেম্বার, অভিযোগ এলাকাবাসীর।
৯ ফেব্রুয়ারী পুলিশের অভিযানে ১৭ লাখ ৭৫ হাজার পিস ইয়াবা, নগদ ১ কোটি ৭০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ও জহিরুল ইসলাম ফারুকসহ ৫ জন মাদক পাচারকারীকে আটক করার পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেন জলদস্যু ফারুক ইয়াবা ডন হয়ে উঠা অজানা তথ্য।
কক্সবাজারে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৭ লক্ষ ৭৫ হাজার ইয়াবা ও নগদ ১ কোটি ৭০ লাখ ৬৩ হাজার টাকাসহ ৫ জন মাদক পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে।
৯ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডী ব্রীজের কাছাকাছি একটি ফ্রিশিং ট্রলার থেকে সাত বস্তা ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। সেখানে ইয়াবার পরিমাণ ছিল ১৪ লক্ষ পিস। এসময় আটক করা হয় মাদক পাচারকারী চক্রের ৪ সদস্য কক্সবাজার পৌরসভার উত্তর নুনিয়ার ছড়া মো. নজরুল ইসলাম ও রাজু মেম্বারের ছেলে মো. জহিরুল ইসলাম ফারুক (৩৭), একই এলাকার মো. মোজ্জাফরের ছেলে মো. নুরুল ইসলাম বাবু (৫৫)।
পরে আটক করা হয় ফারুকের শাশুড় আবুল হোসেনের ছেলে আবুল কালাম (৫৫) ও আবুল কালামের ছেলে শেখ আবদুল্লাহ (২০)। অভিযানে নেতৃত্বদেন জেলা পুলিশ সুপার মোঃ হাসানুজ্জামান। এছাড়া আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে বিকেল ৫টায় ইয়াবা পাচারের মূলহোতা শহরের নুনিয়ারছড়ার ফারুকের বাড়ি থেকে নগদ ১ কোটি ৭০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ভর্তি দুই বস্তা উদ্ধার করা হয়।
পরে সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আটক ফারুকের চাচা শ্বাশুডর ছৈয়দ আলমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরো ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার ইয়াবাসহ ছৈয়দ আলমের স্ত্রী ছমিরা আটক করে জেলা পুলিশ।
জেলা পুলিশের মতে, পুলিশের অভিযানে ইয়াবার বৃহৎ চালান আটকের ঘটনা এটি।
এঘটনায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাও করেছে পুলিশ।
এদিকে, লাখ লাখ পিস ইয়াবা আটক ও কোটি কোটি নগদ টাকা উদ্ধারের পর বিষয়টি টক অব দ্যা ডিস্ট্রিক্টে পরিণত হয়।
সবার একটাই প্রশ্ন, ইয়াবা ডিলার ফারুক একদিনে মাদক কারবারী হয়ে উঠেনি। মাছ শিকারের আড়ালে সাগর পথকে ইয়াবা পাচারের প্রধান রুট ও নুনিয়াছড়াকে ইয়াবা মজুতের ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
তার দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ নেটওয়ার্ক আর দীর্ঘ করেছিল মাদক কারবারী সিন্ডিকেট। সম্প্রতি শহরের গাড়ির মাঠ এলাকা থেকে ইয়াবাসহ আটক হন ঈদগাও এলাকার বাসিন্দা মো. ফারুকের ভগ্নিপতি।
তার সাথে মাদক ব্যবসায় দুইজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর সম্পৃক্ততা এখন লোকের মুখে মুখে। স্থানীয় এক কাউন্সিলর ইয়াবা কিং ফারুকের গড ফাদার হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ওই কাউন্সিলরের নির্বাচনে বেশি ভাগ ব্যয় নির্বাহ করেছে ফারুক। এছাড়াও উক্ত কাউন্সিলরের ভগ্নিপতিসহ নিকটাত্মীয় স্বজনকে ফারুকের সাথে ইয়াবা সিন্ডিকেট করেদিয়ে ছিল।
এছাড়াও উত্তর নুনিয়াছড়া শফিউল্লাহর ছেলে আজাদ ছিল তার প্রধান পার্টনার। আজাদের বাবা শফি উল্লাহ ও তার মাকেও ইয়াবাসহ আটক করেছিল পুলিশ। আজাদ ইয়াবাসহ আটক হন। তার পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক মামলাও রয়েছে।
এই ফারুক ইয়াবা ব্যবসা করে অন্তত ৫০ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছে। কিনেছে ফিশিং ট্রলার, জমিজমা। প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বড় ফিশিং ট্রলার নুনিয়াছড়া নুরুল হক কোম্পানির ডগে আছে। মাছ ব্যবসায় মোটা সুদে দাদন দিয়েছে কোটি কোটি টাকা। সাগরে জলদস্যুতা, ইয়াবা ব্যবসা ছাড়াও মানবপাচারেও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে এই ইয়াবা কিং ফারুকের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহেনা আকতার পাখি বলেন, মো. ফারক একজন প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ী। মাছ ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা পাচার করে আসছিল। তিনি বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গেলে অন্যান্য জেলেরা লোকসান গুনলেও বরাবরই ফারুক লাভের মুখ দেখত। এতোদিন পর বুঝা গেল সাগরের মাছ ধরার আড়ালে মুলত ইয়াবা ব্যবসাই করেছিল ফারুক।
এই সিন্ডিকেটে কারা কারা জড়িত তদন্ত করে পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনার দাবী করেন তিনি।
এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে মো.ফারুকের নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র জলদস্যু বাহিনী সাগর ব্যাপক তান্ডব চালায়। জেলেদের মাছ, জাল ও ট্রলার লুট করে এনে কক্সবাজার শহরের ফিশারী ঘাটে বিক্রির চেষ্টা করে। তৎকালীন সময় ফিশারীঘাট আড়ৎদার মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাসুদ আজাদের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীরা ওই জলদস্যু ফারুক, চট্টগ্রামের আহমেদকে ধরে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
সাগরে লুন্ঠিত ৪/৫ লাখ টাকার মাছ, জাল ও বোট আটক করে।
এঘটনায় মধ্যম নুনিয়াছড়ার
আফজল আহম্মদের ছেলে মমতাজ বাদী হয়ে থানায় মামলাও করেন । তৎসময়ে কক্সবাজার সদর থানা ওসি জসীম উদ্দিন এঘটনায় মামলা রেকর্ড করেন। পরে মাছগুলো ম্যাজিষ্ট্রেটের উপস্থিতিতে নিলাম দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন জেলখাটেন জলদস্যু ফারক। জামিনে বের হয়ে ফের শুরু করেন নানা অপরাধ। ফারুকের ছোট ভাই কামরুল গত কয়েক বছর আগে শহরের হলিডের মোড়ে প্রকাশ্যে ১০ লাখ টাকা ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়ার সময় জনতার সহযোগীতায় কামরুলকে আটক করে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ।
পরে অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশের সাথে কামরুলের সহযোগিদের সাথে গোলাগুলির ঘটনায় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী কামরুল। দীর্ঘদিন জেলখাটার পর জামিনে বেরিয়ে আসেন। ফারুক, কামরুল, তার মা রাজু, ফারুকের শ্বাশুর, শ্যালক, চাচা শ্বশুর ও শ্বাশুড়ীসহ অন্যান্য সহযোগীরা
মো. ফারুককে ডনে পরিণত করেন। এসব কিছুর নেপথ্যে ছিল তার মা রাজু মেম্বার ও স্থানীয় এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর।
পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান জানান, এটি একটি মাদক পাচারের বিশাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের সাথে জড়িত থাকলেও আইনের আওতায় আসেনি। সর্বশেষ মঙ্গলবার ৯ ফেব্রুয়ারি দুই জনকে আটক করা হয়। পাশাপাশি তাদের সিন্ডিকেটে আর কারা আছে তা সনাক্তের কাজ চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

 

 

আপনার মন্তব্য দিন