কক্সবাজারে প্রান্তিক চাষীদের রক্তচুষে খাচ্ছে লবণ মিল মালিক সিন্ডিকেট

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, সম্পাদক, নিউজ কক্সবাজার ।।

কক্সবাজারে প্রান্তিক লবণ চাষীদের রক্তচুষে খাচ্ছে লবণ মিল মালিক সিন্ডিকেট। বছরের পর বছর এ ধারা চলে আসছে।

লবণ মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে লবণের মুল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রতি কেজি ৩ টাকা। আর মিল মালিক সিন্ডিকেট প্রতি কেজি লবণ বিক্রি করছে (৭৪ কেজি বস্তা) ৭ টাকা ৫০ পয়সা।
অথচ এ বছর প্রতিকেজি লবণ উৎপাদন খরচ পড়েছে ৭-৮ টাকা। কিন্তু কেজি ৫ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে না। মধ্যস্বত্বভোগী ও আমদানি করা সোডিয়াম সালফেট ভোজ্য লবণ হিসেবে বাজারে বিক্রি হওয়ায় এবং লবণ মিল মালিকদের কারসাজিতে কক্সবাজার জেলার প্রান্তিক চাষীরা উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না বলে অভিযোগ।
এবার লবণ চাষের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে প্রান্তিক চাষিদের কাছে এখনো গত বছরের প্রায় ৪ লাখ মেট্রিকটন লবণ মজুত রয়েছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় গেল বছর লবণ বিক্রি করেননি চাষীরা।

কক্সবাজারের কক্সবাজার সদর, ঈদগাঁও,, টেকনাফ, পেকুয়া, মহেষখালী, কুতুবদিয়া ও বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকায় লবণের চাষ হয়ে আসছে। ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত লবণ উৎপাদন চলবে। প্রায় ৫৮ হাজার হেক্টর জমিতে লবণ চাষাবাদ করা হচ্ছে। এই লবণ চাষের সঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার চাষি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। তাদের জীবিকার প্রধান উৎস লবণ চাষ। এসব চাষি লোকসান হলেও বংশানুক্রমে লবণ আবাদে জড়িত রয়েছেন। চাষিরা জানান, লবণ উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে। জমির খাজনা, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম বাড়ছে না।

ক্রেতারা জানান, বাজারে প্রতিকেজি প্যাকেটজাত লবণের দাম ৩০/৩৫ টাকা।
প্রশ্ন হচ্ছে কষ্টার্জিত প্রান্তিক লবণ চাষীদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৩ টাকা দামে ক্রয় করে বাজারে ৩০ টাকা দামে কেন বিক্রি করা হচ্ছে? দামের বিশাল পার্থক্য গড়ে দেয়ার জন্যে মধ্যস্বত্ত্ব ভোগীদের এই কারসাজি বলে জানান তারা।

কক্সবাজার সদরের বিসিক শিল্প নগরী ইসলামপুরে রয়েছে অর্ধশতাধিক লবণ মিল। লবণ মিল মালিক সিন্ডিকেটের গ্যাড়াকলে পড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে লবণ শিল্প।

এছাড়াও প্রান্তিক চাষীরা জানান, খুচরা পযার্য়ে প্রান্তিক লবণ চাষীদের থেকে ক্রয় বস্তা প্রতি ২ মণ বা ৮০ কেজির পরির্বতে ৯৬ কেজি ৩৮০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা। প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে অন্তত ১৬ কেজি লবণ।

সারা দেশে লবণ মিল মালিকের বিক্রি প্রতি বস্তা (২মণ) ৭৬ কেজি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা।আবার ১ম দফায় প্রতি বস্তায় ২০ কেজি লবণ ঘাটতি দেখিয়ে চাষীদের রক্তচুষা শুরু করে।

৯৬ কেজি থেকে ৭৬ কেজি ওজন পার্থক্য ২০ কেজি ) তারপর দাম পার্থক্য ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। একদিকে ২০ কেজি করে অতিরিক্ত লবণ লুটে নিচ্ছে প্রতি ২ মণে।

অন্যদিকে, একটি লবণ মিলে যদি ১ শিপ্টে লবণ ওয়াশ (ক্রাশ) করা হয় ,তাহলে পরিমাণ দাড়ায় ১৪০০ মণ।
মাসে কমপক্ষে ৪/৫ শিপ্ট যদি লবণ ওয়াশ বা ক্রাশ করে সারা দেশে বিক্রি করে তাহলে মোট খরচ বাদ দিয়ে লাভের পরিমান দাড়ায় কত……??

এখানে প্রশ্ন দাড়াঁচ্ছে আর কত নিজেদের মুনাফা আকাশ ছোঁয়া করতে লবণের এ বিরাট দামের পার্থক্য করা হবে, এ প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই।

সচেতন মহলের মতে, বার বার প্রান্তিক লবণ চাষীরা কেন তাদের ন্য্যয্য মূল্যে থেকে বঞ্চিত হবে..?? যেমন ইচ্ছে তেমন করে মাঠ পযার্য়ে খুচরা দাম বাড়াবে আর কমাবে লবণ মিল মালিক সিন্ডিকেট।
বিসিক কক্সবাজার কার্যালয়ের ডিজিএম হাফিজুর রহমান জানান, চাষিদের কাছে গত বছরের প্রায় ৪ লাখ মেট্রিকটন লবণ অবিক্রিত অবস্থায় মজুত রয়েছে। লোকসানের কারণে তারা বিক্রি করেননি। এবার প্রথম দফায় ১ হাজার ৬০০ চাষিকে ৫ শতাংশ সরল সুদে ১ লাখ টাকা করে ঋণ দেওয়া হবে। ছয় মাসের মধ্যে তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন।

জানা যায়, দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে এবার ১৯ লাখ মেট্রিকটন নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশে মোট উৎপাদিত লবণের মধ্যে ভোজ্য লবণের চাহিদা প্রায় ১০ লাখ টন, শিল্পের চাহিদা ৩ লাখ ৭৮ হাজার টন, প্রাণিসম্পদ খাতে ২ লাখ ২৩ হাজার টন এবং মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণে দশমিক শূন্য ১ টন লবণের চাহিদা রয়েছে। তবে লবণ মিল মালিকদের তথ্যমতে, দেশে বছরে লবণের মোট চাহিদা প্রায় ২০ লাখ মেট্রিকটন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্প বিকাশের কারণে লবণের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের মতে, ভোজ্য লবণের চাহিদা ৯ লাখ টন আর শিল্পসহ অন্যান্য খাতে লবণের চাহিদা ১১ লাখ মেট্রিক টন।

চলতি মৌসুমের শেষের দিকে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হালকা বৃষ্টি হওয়ার কারণে কিছুটা মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়ায় চাষীরা স্বপ্ন বুক বেঁধে ছিল।
কিন্তু আবারো ১/২ দিন পরে কোন কারণ ছাড়া লবণ মিল সিন্ডিকেট প্রান্তিক মাঠ পর্যায়ে মূল্য কমিয়ে চড়া মূল্যে নিজেদের মুনাফা করার জন্যে সারা দেশে লবণ বিক্রি করে চলেছে।

প্রান্তিক লবণ চাষীরা এর জন্যে ইসলামপুর লবন মিল মালিক সিন্ডিকেটকে দায়ী করছে। লবণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশে বছরে সোডিয়াম সালফেটের চাহিদা ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টন। অথচ বছরে প্রায় ৫ লাখ টনের বেশি সোডিয়াম সালফেট আমদানি হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে এবং দেশীয় লবণশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অবিলম্বে লবণের দামের বৈষম্য দূর না করলে প্রান্তিক চাষীরা আন্দোলনে নামবে বলে জানিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন প্রান্তিক চাষীরা।

 

 

আপনার মন্তব্য দিন