কক্সবাজার কাস্টমস অফিসের সকল রাজস্ব কর্মকর্তা একযোগে বদলী

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, সম্পাদক, নিউজ কক্সবাজার ।।

কক্সবাজার কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের ডেপুটি কমিশনার সুশান্ত পালের বদলীর পর এবার একযোগে বদলী করা হয়েছে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সালাউদ্দিন, তৌফিক আহমেদ, আনিসুল করিম, জসিম উদ্দিন ও সৈয়দ আবু রাসেলকে। এ সকল সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে বিভিন্ন জেলায় বদলী করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে প্রকাশ।
চট্টগ্রামের কমিশনারেট মোহাম্মদ আকবর হোসেন স্বাক্ষরিত  পত্র নথি নং – ২য়/১১৪-ইটি সহ. রাজস্ব কর্মকর্তা/ বদলী/১৩ (অংশ-১)/১৬/৮৬১ ( ১-৭০) এ বদলীর আদেশে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ২০ ডিসেম্বর ২০২০  পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইনে কক্সবাজার কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসে ঘুষের মহোৎসবের কারণে সরকার হারায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। এছাড়াও বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে “মাসিক চুক্তির কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারালেও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ ছিল নিশ্চুপ। এনিয়ে গত ২০ ডিসেম্বর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ হলে প্রশাসনের টনক নড়ে। পরবর্তীতে গত জানুয়ারী মাসে
কক্সবাজার কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের ডেপুটি কমিশনার সুশান্ত পালকে সদর দপ্তরে ও অতিরিক্ত দায়িত্বে বান্দরবান বিভাগে বদলি করা হয়ছে।চট্টগ্রামের কমিশনার মোহাম্মদ আকবর হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে পত্র নথি নং-০৮.০১.২০০০.২০২.৪৩.২০২১।
ঘুষ বাণিজ্যের সিন্ডিকেট প্রধান সুশান্ত পালকে বদলি করার পর বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে দুর্ণীতি দমন কমিশন দুদক।
ভ্যাট কর্মকর্তাদের মাসোহারার মাধ্যমে অভিজাত হোটেল রেস্তোরাঁগুলোতে বছরের পর বছর রাজস্ব ফাঁকি চলছে পর্যটন শহর কক্সবাজারে। পর্যটন নগরীতে হোটেল সুবিধা দেয়া চারশত হোটেলের মধ্যে প্রায় তিনশ হোটেলে ভ্যাট ফাঁকিসহ ভ্যাট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে কক্সবাজারের নামীদামী হোটেলগুলোতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার সার্কেল কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে পর্যটনসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সাথে মাসিক চুক্তিতে মাসোহারা আদায়, হয়রানি, চারশটিরও অধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান হতে বিধি অনুযায়ী ভ্যাট আদায় না করে মাসিক মাসোহারা গ্রহণ, তালিকাভুক্ত রেস্টুরেন্টগুলোর নিয়মিত ভ্যাট প্রদান না করা, কক্সবাজার সার্কেলের আওতাধীন প্রায় ১২ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন ও রাজস্ব প্রদান ব্যতিরেকে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কলাতলীর হোটেল মোটেল জোনসহ বিভিন্ন এলাকা অনিবন্ধিত প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতাভুক্ত না করে মাসোহারা আদায় ও সেন্টমার্টিনগামী জাহাজগুলো থেকে টাকার বিনিময়ে ভ্যাট মওকুফ করা হচ্ছে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা করেছে দুদক। দুদক এনফোর্সমেন্ট ইউনিটে জমা হওয়া একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর সহকারী পরিচালক রতন কুমার দাসের নেতৃত্বে ৯ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার এ অভিযান পরিচালিত হয়। দুদক টিমের সরেজমিন অভিযানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
দুদক সূত্র জানায়, কঙবাজারের অস্টারিকো আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে দেখা যায়, হোটেল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন যাবত নিয়মিতভাবে ভ্যাট ফাঁকির উদ্দেশে দুইটি রেজিস্ট্রার ব্যবহার করে আসছে। একটি রেজিস্টারে হোটেলের লেবেল ও রুম প্রকৃত সংখ্যার ভিত্তিতে সরকার নির্ধারিত ভ্যাটের হিসাব রাখে। অন্য রেজিস্টারে হোটেলের লেবেল ও রুম সংখ্যা কম দেখিয়ে পরস্পর যোগসাজশে ভ্যাট অফিসে মাসোহারা দিয়ে ভ্যাটের টাকা ফাঁকি দিয়ে আসছে। এছাড়া সী উত্তরা আবাসিক হোটেলে দুদক টিমের উপস্থিতি টের পেয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের ভ্যাট প্রদানের রেজিস্টার গায়েব করে ফেলে। তবে ভ্যাট সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে ভ্যাট ফাঁকির সত্যতা পাওয়ার বিষয়ে হোটেলটি থেকে কিছু কাগজপত্র জব্দ করে।
এছাড়াও দুদক টিম আরো দুটি রেস্টুেরন্টে অভিযান চালিয়ে জানতে পারে, রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদেরকে মূসক চালান প্রদান না করে, মনগড়া মূসক ধরে বিল করে। এসময় উপস্থিত লোকজন অভিযোগ করে দুদক টিমকে জানায়, খাবারের বিলের সাথে মূসক হিসেবে আদায়কৃত অর্থ রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ, কঙবাজার কাস্টমস, এঙাইজ ও ভ্যাট অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে আত্মসাত করে।

চট্টগ্রামের কমিশনারেট মোহাম্মদ আকবর হোসেন স্বাক্ষরিত  পত্র নথি নং – ২য়/১১৪-ইটি সহ. রাজস্ব কর্মকর্তা/ বদলী/১৩ (অংশ-১)/১৬/৮৬১ ( ১-৭০) এ বদলীর আদেশে এবার বদলী করা হয়েছে কাস্টমস সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্য সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা যথাক্রমে সালাউদ্দিন, তৌফিক আহমেদ, আনিসুল করিম, সৈয়দ আবু রাসেল ও জসিম উদ্দিন সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।

জানা যায়, ইতোমধ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ঘুষ-দুর্নীতি ও সরকারের রাজস্ব লুটপাট হওয়ার বিষয়টি তদন্তের জন্য মাঠে নেমেছেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তাদের সিন্ডিকেটের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কি পরিমাণ অর্জন করেছে তা দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
প্রসংগত, ৯ ফেব্রুয়ারী  কক্সবাজার হোটেল মোটেল জোনে ভ্যাট ফাকিঁর অভিযোগে অভিযান চালায়  দুর্নীতি দমন কমিশন ( দুদক)।
প্রাথমিক অভিযানে ভ্যাট কারচুপির প্রমাণ পায় দুদক। এতে নড়েচড়ে বসেন কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কমিশনারেট এর এক আদেশে  কক্সবাজার  কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসের  সকল সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের বিভিন্ন জেলায় একযোগে বদলী করা হয়।
জানা যায়, কক্সবাজার কাস্টমস এক্সাসাইজ ও ভ্যাট অফিসে কর্মরত কর্মকর্তাদের অত্যাচার ও হুমকি-ধমকির কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা দুর্বিষহ হয়ে উঠে। কর্তারা যা বলেন তা জ্বী স্যার বা হুজুর বলে করে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের কথার উপর দ্বিমত পোষণ করলে বিভিন্ন ধরনের হয়রানিসহ প্রতিষ্ঠানের ডকুমেন্ট, পিসি জব্দ করে নিয়ে এসে লাখ লাখ টাকায় তাদের সাথে দফারফা করে ছাড়িয়ে আনতে হয়।
ব্যবসায়ীরা বলেন, আমরা আছি এক মহাযন্ত্রণায়। এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারে সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআর ও দুদকের হস্তক্ষেপের ফলে। তখনি ব্যবসায়ীরা তাদের মতো সিন্ডিকেট ঘুষখোরদের লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা থেকে রেহায় পাবে।

আপনার মন্তব্য দিন