কখনো গোয়েন্দা, কখনো সাংবাদিক— কাজ তার নারীদের সঙ্গে প্রতারণা

ওমর ফারুক হিরু

নাম মো. আবু সাঈদ (৩০)। কখনো পরিচয় দেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য হিসেবে, কখনো পরিচয় দেন সাংবাদিক হিসেবে। গোয়েন্দা হিসেবে যখন পরিচয় দেন, তার পরনে থাকে ইউনিফর্ম, হাতে ওয়াকিটকি। আর সাংবাদিক পরিচয়ের কার্ডও থাকে পকেটে, ব্যবহার করেন ‘প্রয়োজন’ বুঝে। প্রকৃত পরিচয়ে এই আবু সাঈদ একজন প্রতারক। সাংবাদিকতার কার্ড নিয়ে করে থাকেন নিয়োগ বাণিজ্য। আর গোয়েন্দা সদস্য পরিচয়ে চাকরি দেওয়ার নামে নারীদের টার্গেট করে বিছিয়ে থাকেন প্রতারণার জাল। ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন টাকা। শুধু তাই নয়, নারী পাচার ও মাদক পাচারের মতো অভিযোগও রয়েছে তার নামে।

আবু সাঈদ চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের মো. সৈয়দুল আহম্মেদের ছেলে। ভুক্তভোগী একাধিক নারী-পুরুষসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চাকরি দেওয়ার নামে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার মেয়েদের ফাঁদে ফেলেন তিনি। এরপর কক্সবাজারের আবাসিক হোটেলে নিয়ে এসে রাখেন সেসব মেয়েদের। এরপর সেখানে তাদের ‘আপত্তিকর’ ছবি-ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করেন সাঈদ।

আবু সাঈদের কাছে প্রতারিত হয়েছেন ঢাকার খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সাবিহা আক্তার (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, মাস দেড়েক আগে সাঈদের সঙ্গে তার পরিচয় ফেসবুকে। ওই সময় সাঈদ তাকে জানান, তার বাড়ি রাজশাহী। তিনি অবিবাহিত। চাকরি করেন সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থায়। কর্মস্থল রোহিঙ্গা ক্যাম্প। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি ওয়াকিটকি হাতে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থার কিছু ছবি পাঠান মেসেঞ্জারে। কথপোকথনের একপর্যায়ে তিনি সাবিহাকে গোয়েন্দা সংস্থায় চাকরির প্রস্তাব দেন। আর এর জন্য সাবিহাকে এক লাখ টাকা দিতে হবে বলে জানান তিনি।

সাবিহা’র সঙ্গে সাঈদের মেসেঞ্জার কথোপকথনের প্রমাণ রয়েছে সারাবাংলার কাছে। তাতে দেখা যায়, সাঈদ বিবাহিত হলেও অবিবাহিত দাবি করে একপর্যায়ে সাবিহাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। জানান, গোয়েন্দা সংস্থায় চাকরি পেলে সাবিহা নিজস্ব পিস্তল পাবেন। তার জন্য আরও নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। এসব কথোপকথনে বিশ্বাস করে আবু সাঈদকে এক লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন সাবিহা।

এর মধ্যে গত ১০ অক্টোবর সাবিহাকে ফোন করে আবু সাঈদ জানান, তার চাকরি নিশ্চিত হয়ে গেছে। কক্সবাজারে যেতে হবে। সাঈদের কথামতো সাবিহা ১১ অক্টোবর চলে যান কক্সবাজার। কলাতলীর একটি হোটেলে ওঠেন আবু সাঈদের সঙ্গে। পরদিন আবু সাঈদ জানান, সাবিহার কোনো বান্ধবী থাকলে তাদেরও চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন। এ কথা শুনে সাবিহা তার দুই বান্ধবী কবিতা (ছদ্মনাম) ও রাফিয়াকে (ছদ্মনাম) কক্সবাজারে ডেকে নেন ১৩ অক্টোবর। তারাও একই হোটেলে ওঠেন। তাদের বলা হয়, ‘বিবিসি নিউজ ২৪’-এ চাকরি দেবেন।

একপর্যায়ে তিন বান্ধবীর সন্দেহ হলে তারা অফিসের বিষয়ে জানতে চান। আবু সাঈদ এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে ‘বিবিসি নিউজ ২৪’-এর প্রকাশক ও সম্পাদকের কথা বলেন। জানান, তিনি অনেক প্রভাবশালী, অনেক টাকা-পয়সা ও বাড়ি-গাড়ির মালিক। তার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখলে জীবনে আর কিছু লাগবে না! এরই মধ্যে আবু সাঈদকে তার কথিত বসের সঙ্গেও কথা বলতে দেখেন সাবিহা। কথোপকথনে তারা খারাপ ইঙ্গিতও শুনতে পান। পরে তিন বান্ধবী নিশ্চিত হন, তারা বিপদে পড়তে যাচ্ছেন। এসময় চাকরির বিষয় নিয়ে বারবার জিজ্ঞাসা করলে আবু সাঈদ পরদিন সকালে আরেকটি আবাসিক হোটেল ঠিক করতে যাওয়ার কথা বলে পালিয়ে যান। পরে তিন বান্ধবী দেখতে পান, তাদের ব্যাগে কোনো টাকা-পয়সা নেই।

আবু সাঈদের প্রতারণায় কপর্দকহীন হলেও দুপুর ১২টায় হোটেল ছাড়তে হয় তিন বান্ধবীকে। পরে তারা সহযোগিতার জন্য আবু সাঈদের মাধ্যমে পরিচয় হওয়া কক্সবাজারের দু’জনকে ফোন করেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, আবু সাঈদ পালিয়ে অন্য একটি হোটেলে অবস্থান করছেন। ওই দু’জনের সহযোগিতা নিয়ে তিন বান্ধবী আবু সাঈদকে ধরে ফেলেন। এসময় চাকরির নামে নেওয়া টাকা ফেরত চাইলে পরে টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করে আবু সাঈদ তার স্ত্রীকে ফোন করে তিন বান্ধবীর গাড়িভাড়া বাবদ ১২ হাজার টাকা দিয়ে সটকে পড়েন।

সাবিহার দুই বান্ধবীর সঙ্গেও কথা হয়েছে সারাবাংলার। তারা বলেন, আবু সাঈদ একজন প্রতারক। কথিত ‘বিবিসি নিউজ ২৪’-এ চাকরি দেওয়ার নাম করে তিনি তাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই দুই বান্ধবীর ধারণা, কথিত সেই বসের সঙ্গে দেখা করিয়ে তাদের হয়তো পাচার করার পরিকল্পনাও করে থাকতে পারেন সাঈদ।

‘বিবিসি নিউজ ২৪’ পোর্টালটি ভিজিট করে দেখা যায়, এটি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি অনলাইন পোর্টাল। এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহামুদুল হাসান রাকিব। কক্সবাজারে এই অনলাইন পোর্টালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, তারাও আবু সাঈদের বাড়ি রাজশাহী হিসেবে জানেন। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও এই পোর্টালের ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে পরিচয়পত্র নিয়ে বেড়ান। তার সঙ্গে প্রকাশক-সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাকিবের ‘সুসম্পর্ক’ রয়েছে বলে জানান তারাও। আর সে কারণেই আবু সাঈদ কক্সবাজারে গেলে তাকে বাড়তি ‘কদর’ করার নির্দেশ রয়েছে তাদের কাছে।

পোর্টালটির কক্সবাজার প্রতিনিধিরা বলছেন, আবু সাঈদ বেশ কয়েকবার কক্সবাজারে এসেছেন। প্রতিবারই তার সঙ্গে কোনো না কোনো নারী ছিলেন। তাদের কাউকে স্ত্রী, কাউকে বান্ধবী, কাউকে সহকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। সাঈদ টাকার বিনিময়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিনিধি নিয়োগও দিয়েছেন। অন্যদিকে যেসব নারীদের নিয়ে আবু সাঈদ কক্সবাজার আসতেন, তাদের মাধ্যমে মাদক পাচার করে থাকতে পারেন বলেও সন্দেহ তাদের।

ওই অনলাইন পোর্টালের প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য বলছে, রামুর দু’জন প্রতিনিধির কাছ থেকে কার্ড বাবদ ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া উখিয়া প্রতিনিধির কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৮ হাজার টাকা, চকরিয়া প্রতিনিধির কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৩ হাজার টাকা, টেকনাফ প্রতিনিধির কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার টাকা। একইভাবে আরও বেশ কয়েকজনের কাছ থেকেই আবু সাঈদ টাকা নিয়েছেন, যার একটি অংশ প্রকাশক ও সম্পাদকও পেয়েছেন বলে জানান প্রতিনিধিরা। তবে চাকরির নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রতিনিধিদের কেউ নাম প্রকাশ করতে সম্মত হননি।

এদিকে, সাঈদ ও তার সহযোগীরা ‘বিবিসি নিউজ ২৪’ পোর্টালের ঢাকার সাবেক এক প্রতিনিধির কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নামে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। নারী কেলেঙ্কারি মামলায় বেশ কিছুদিন তাকে জেল হাজতেও থাকতে হয়েছিল বলে তথ্য মিলেছে।

এসব বিষয়ে জানতে ‘বিবিসি নিউজ ২৪’-এর প্রকাশক-সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রাকিবের সঙ্গে কথা বলেছেন সারাবাংলার এই করেসপন্ডেন্ট। আবু সাঈদ তার পোর্টালের প্রতিনিধি— এটি স্বীকার করে নেন তিনি। তবে প্রতিনিধিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার তথ্য অস্বীকার করেছেন। অনলাইন পোর্টালটির অনুমোদনের ব্যাপারেও কিছু বলতে পারেননি তিনি।

রাকিব জানান, আবু সাঈদ নারীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন, এটি তিনি শুনেছেন। তবে সাবিহা নামে একজনের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নামে এক লাখ টাকা নয়, ৫০ হাজার টাকা সাঈদ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানান। বিভিন্ন কারণে সাঈদকেতার পোর্টাল থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে জানান রাকিব।

এ ব্যাপারে জানতে আবু সাঈদের মোবাইল নম্বরে কল করা হলে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে গত ১৪ অক্টোবর আবু সাঈদ যখন তিন বান্ধবীর কাছে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে নাজেহাল হন, তখন ভিডিওতে স্বীকার করে নেন তিনি কোনো ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার কোনো সদস্য নন। মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়েই তিনি চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণও সারাবাংলার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। সারাবাংলা

আপনার মন্তব্য দিন