টানা তিন দিনের ছুটিতে কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকের ঢল

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন।।

টানা ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে নেমেছে পর্যটকের ঢল। এর ফলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই কোথাও। সৈকতের পাশাপাশি অন্যান্য পর্যটন স্পটগুলোতেও ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। এসব পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেয়া হয়েছে নানা ব্যবস্থা। সেবা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করছে। তবে পর্যটকদের তেমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি, যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

দু’দিনের সাপ্তাহিক ছুটির সাথে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারির এক দিনের সরকারি ছুটি। ফলে আগে থেকেই অনেকের প্রস্তুতি ছিল কক্সবাজার আসার। এরমধ্যে অনেকেই বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়ে কক্সবাজার ছুটে আসে।

এসব পর্যটকদের মাঝে খুব স্বল্প সংখ্যককে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ পর্যটকের মুখে কোনো মাস্ক নেই। মানছেন না স্বাস্থ্যবিধিও।

খুলনার খালিশপুর থেকে আসা পর্যটক দম্পতি রুহি ও ফয়সাল জানান, তারা বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বুধবার রাতেই কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা করে। পূর্ব থেকে বুকিং দেয়া ছিল তাদের রুম। ফলে কোন কষ্ট হয়নি।

মানিকগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক, নুরাইন, তাহিরা ওয়াসিয়া বলেন, কক্সবাজার এসে অনেক ভালো লাগছে। লকডাউন এর কারণে অনেকদিন থেকে বাসাবাড়িতে বন্দী ছিলাম। সেই ক্লান্তি দূর করতে কক্সবাজার এসেছি।

সিলেট থেকে আসা পর্যটক আল আজাদ, রফিকুল ইসলাম বলেন: অনেক কষ্ট করে রুম পেয়েছি। একমাস আগেই বুকিং দেওয়ার পরও দ্বিগুণ টাকা দিতে হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী করিমুল ইসলাম, ফরহাদ হোসেন, রাকিবুল ইসলাম ও আসিফ ইব্রাহিম বলেন: অনেকদিন পর বন্ধুরা মিলে গ্রুপ করে কক্সবাজার ঘুরতে আসলাম। করোনা মহামারী আর লকডাউন এর কারণে দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমাদের। এখানে এসে মনে হচ্ছে মনে স্বস্তির হাওয়া লেগেছে।

নাজিরারটেক থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সমুদ্রের ১২ কিলোমিটার এলাকায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক এর ভিড় রয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ছাড়াও, ইনানী, হিমছড়ি, পাটুয়ারটেক, মাথিনের কূপ, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, রামুর বৌদ্ধবিহার সহ নানা পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকদের ভিড় দেখা গেছে।

ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন: এবার অনেক পর্যটক এসেছে। করোনা মহামারীর কারণে আমরা অনেক লস দিয়েছি। এবার হয়তো কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবো।

গাজীপুর থেকে আসা পর্যটক রফিকুল ইসলাম, ফরিদুল আলম অভিযোগ করে বলেছেন: হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে তিনগুণ ভাড়া নিয়েছেন। এছাড়া খাবারের দাম এখানে বেশি বলে এই পর্যটকরা অভিযোগ করেন।

কক্সবাজার গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, থার্টিফাস্ট নাইট, ইংরেজি বর্ষকে বিদায়-বরণ ও জানুয়ারির শীতকালীন অবকাশসহ সরকারি বিভিন্ন ছুটি উপভোগ করতে কক্সবাজারে আসেন লাখ লাখ পর্যটক। কিন্তু বর্তমানে এই মৌসুমে অনেক পর্যটক আসায় অনেক হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস বুকিং নিয়েছেন। এর আগে হোটেলগুলো কমবেশি নিত্যদিন ব্যবসা করলেও বেশিরভাগ রুম খালি থাকত। তবে, সপ্তাহিক ছুটিসহ স্বাধীনতা দিবসের ছুটির কারণে এখন পর্যটকে টৈ টম্বুর কক্সবাজার। শুক্রবার সকাল থেকে জেলার পর্যটন স্পটগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা।।

কক্সবাজার হোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোটেল দ্য কক্স টুডের এমডি আব্দুল কৈয়ুম বলেন: আমাদের মানের হোটেলগুলো প্রায় একমাস আগেই বুকিং হয়ে গিয়েছিল। আমরা কোন প্রকার মূল্য বাড়াইনি। তবে করোনার কারণে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের মানের হোটেলগুলো অনেকেই এখনও পুরোপুরি অপারেশনে যেতে পারেনি। এরকম পর্যটকের আগমন এর হার অব্যাহত থাকলে আমরা ক্ষতি অন্তত কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবো।

কক্সবাজার হোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব ওমর সুলতান বলেন: আমাদের সব হোটেলের কক্ষগুলো অনেক আগে থেকেই বুকিং হয়ে গেছে। আজকেও অনেক পর্যটককে আমরা ফেরত দিয়েছি কক্ষ খালি না থাকায়।

কক্সবাজার রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সহ-সভাপতি কাসেম আলী বলেন: করোনার কারণে আমাদের অনেক রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে আছে এখনও। যেখানে চার শতাধিক রেস্টুরেন্ট ছিল, সেখানে এখন দুই শতাধিক এর মত চালু আছে। তবে আমরা বলছি যাতে সবাই খাবারের মান আর মূল্য ঠিক রাখে।

অন্যদিকে পর্যটকরা যাতে কোন প্রকার হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য জেলা প্রশাসন ও র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ কয়েকটি টিম কাজ করছে। সৈকতে গোসল করতে নেমে যাতে কোন পর্যটক হারিয়ে না যায় সেজন্য কাজ করছে লাইফগার্ড কর্মীরা।

লাইফ গার্ড কর্মী ইয়াসিন বলেন: তারা শুক্রবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত পানিতে ভেসে যাচ্ছিল এরকম চারজন পর্যটককে উদ্ধার করেছে।

কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার জিল্লুর রহমান বলেন: আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতসহ পর্যটন স্পটগুলোতে টুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা কাজ করছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান পিপিএম বলেন: পর্যটকরা যেহেতু পুরো জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সেজন্য টুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশের টহল বাড়িয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। সিসিটিভি ও ওয়াচ টাওয়ার এর মাধ্যমে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে নিরাপত্তার বিষয়টি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ড. মামুনুর রশীদ বলেন: কোনো পর্যটক যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য জেলা প্রশাসনের দু’টি টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। পর্যটকদের জন্য বিচ কর্মীদের পাশাপাশি বেশ কিছু সেবা সংস্থার সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি আগত পর্যটকরা যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সেজন্য সমুদ্র সৈকতের প্রবেশ পথগুলোতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের সচেতন করা হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য দিন