টেকনাফে অবাধে চলছে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসা, অমান্য হচ্ছে বিস্ফোরক আইন

| বার্তা বাজার |

বিস্ফোরক আইনের নেই কোনো তোয়াক্কা, যে যার যার মতো বোতলজাত (লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) এলপিজি জ্বালানী গ্যাসের আড়ত সাজিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফে। বোতলজাত গ্যাস পরিবহন ও সরবরাহের সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও তা মানছেনা ডিলাররা। এসব ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রয়েছে গ্যাস ওজনে কম দেয়ার অভিযোগ।

সংশ্লিষ্টদের অনুমোদনবিহীন ভাবে শহরের ফুটপাতের দোকান থেকে ফার্মেসী, মুদির দোকান, পান দোকান, স্টেশনারির দোকানসহ জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কের ধারে বোতল ভর্তি গ্যাস বিক্রি চলছে অবাধে। এসব তদারকির অভাবে দিন দিন বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি এবং যে কোন মূহুর্তে জীবন্ত বোমা আকারে বিস্ফোরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও যত্রতত্র গ্যাস বিক্রি বন্ধ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়মিত বাজার মনিটরিং এর বিকল্প নেই বলে অভিমত সচেতন মহলের।

ডিলারগুলোর অধিকাংশ মালিক এলাকার চিহ্নিত ইয়াবা কারবারী এবং অনেকের নাম তালিকায় রয়েছে। বিগত সময়ে টেকনাফ ফেরত খালি গ্যাসের বোতল থেকে কয়েক দফা ইয়াবার চালান আটকের ঘটনাও ঘটেছিলো। বরাবরের মতো খালি বোতলে ভরে অতি কৌশলে ইয়াবার চালান পাচার হচ্ছে বলে ধারণা সচেতন মহলের।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় ছোট বড় মিলিয়ে বিভিন্ন কোম্পানীর মোট ৩০টি বোতলজাত গ্যাস বিক্রির অনুমোদিত ডিলার রয়েছে, তন্মধ্যে সেন্টমার্টিন দ্বীপে রয়েছে ৩টি। ডিলাররা চট্টগ্রাম থেকে গ্যাস ভর্তি বোতল এনে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করে থাকে। বোতলজাত গ্যাস বিক্রয় অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী গ্যাস ভর্তি বোতল নির্দিষ্ট গুদামে মজুদ রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু দুই একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অনুমোদিত স্থানের বিপরীতে তাদের সুবিধা মতো স্থানে শত শত গ্যাস ভর্তি বোতল মজুদ করে রেখেছে। যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে তাদের ৫০০ কেজি অর্থাৎ ৪০টির অধিক গ্যাস ভর্তি বোতল মজুদের অনুমোদন নেই। তাছাড়া যেসব গুদামে বোতল মজুদ রাখা হয়েছে সে সব গুদাম গুলোর এক তৃতীয়াংশ গুদামের ফিটনেস নেই। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে এসব গুদামের অবস্থান এমন জায়গায় রয়েছে যার আশেপাশে তিন ফুটের মধ্যেই বেশ কিছু বসতবাড়ি ও জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্টান রয়েছে। যেকোনো সময় দূর্ঘটনা ঘটলে মারাত্মক প্রাণহানির আশংকা রয়েছে।

এছাড়াও পৌর এলাকার এক ডিলার নিয়ম ভঙ্গ করে দমদমিয়া তার ভাইয়ের বাড়িতে সাব ডিলার বানিয়ে নিয়মিত শতাধিক বোতল মজুদ রেখে বিক্রি করছে। একই পথে হাটছে আরো বেশ কিছু ব্যবসায়ী। এসব অবৈধ কর্মকান্ডে সহযোগীতা করছে অপারেটর কোম্পানীর বিক্র‍য় প্রতিনিধিরা। এছাড়াও প্রতিটি বোতলে ১২ কেজি গ্যাস থাকার নিয়ম থাকলেও ওজনে কম দেয়ার অভিযোগ ক্রেতাদের।

এদিকে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমতি ব্যতিত যেকোনো প্রতিষ্ঠানে বোতলজাত এলপিজি গ্যাস বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও উপজেলার মুদির দোকান, চাউলের দোকান, পান দোকান, স্টেশনারী, ফার্মেসী থেকে শুরু করে যত্রতত্র রাস্তার ধারে গ্যাস ভর্তি বোতল বিক্রি হচ্ছে। কোনোকোনো দোকানি ২০/২৫ বোতল গ্যাস মজুদ রাখছে সবসময়। দোকানের সামনে স্তুপ করে রাখা বোতলের গায়ে যখন রোদের তাপ লাগে তখন উত্তপ্ত বোতলের গায়ে এক মিনিট হাত রাখা দায় হয়ে পড়ে। উচ্চ তাপমাত্রায় যে কোনো সময় বিস্ফোরণ হলে জনচলাচলের স্থানগুলোতে প্রাণহানি ঘটে যেতে পারে। এমনকি এসব দোকানগুলোতে নেই কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। চলতি মাসে সরকারিভাবে বোতল প্রতি ১২ কেজি গ্যাস ১ হাজার ৩৩ টাকা মূল্য নির্ধারণ করলেও এসব খুচরা বিক্রেতারা দেড় হাজার থেকে বারো’শ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, ৩০টির মধ্যে হাতে গুনা কয়েকটি ডিলার নিজস্ব গাড়িতে সিলিন্ডার পরিবহন করে থাকে। বিস্ফারক আইন আনুযায়ী গ্যাসের বোতল পরিবহনে নিয়োজিত যানবাহনগুলোকে পরিবহনের আলাদা অনুমোদন থাকার বিধান থাকলেও বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছে মাফিক বিভিন্ন ট্রাক বা পিকআপ ভর্তি করে বোতল পরিবহন করে। এছাড়াও সেন্টমার্টিনে যেসব ট্রলারে করে বোতল পরিবহন করা হয় সেসব ট্রলারগুলো গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহনের জন্য মোটেও উপযোগী নয়।

এসব অনিয়মের বিষয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে আলাপকালে তারা ‘বার্তা বাজার’কে জানান, বিস্ফোরক অধিদপ্তর সবকিছু নিশ্চিত হয়ে আমাদের অনুমোদন দিয়েছে। আমরা নিজেরা কোনো বোতল পরিবহন করিনা, সংশ্লিষ্ট অপারেটর কোম্পানী এসব পরিবহন করে থাকে সুতরাং যানবাহনের অনুমোদন সম্পর্কে কোম্পানী ভালো বলতে পারবে। এছাড়া যানবাহন সংকট হলে মাঝে মধ্যে অনুমোদনহীন যানবাহনে করে বোতল পরিবহনের বিষয়টিও স্বীকার করেছেন তারা। কি পরিমান গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার মজুদের অনুমোদন রয়েছে জানতে চাওয়া হলে, চাহিদা বেশী থাকায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী অতিরিক্ত গ্যাস মজুদ রাখেন বলে জানান। কিছু গোদামে জায়গা সংকটের কারণে গ্যাস ভর্তি বোতলের পাশাপাশি খালি বোতল রাখার কারণে দেখতে বোতলের সংখ্যা অতিরিক্ত দেখায় এমনটি দাবিও করেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিস্ফোরক পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন ‘বার্তা বাজার’কে বলেন- টেকনাফে প্রত্যেক ডিলারকে ৫০০ কেজি বোতলজাত গ্যাস মজুদ রাখার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অনুমোদনে নির্ধারিত গুদাম ব্যাতিত অন্য কোন স্থানে বা গুদামে বোতল জাত গ্যাস মজুদ সম্পূর্ণ বেআইনী। আইন ভঙ্গ করে অতিরিক্ত মজুদ রাখলে বিধিমতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্টানের অনুমোদন বাতিলের বিধান রয়েছে। জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে বোতল বিক্রি অনিরাপদ এবং অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ব্যতিত এমন কর্মকান্ড শাস্তিযোগ্য অপরাধ। লোকবল সংকটের কারণে নিয়মিত বাজার মনিটরিং এর অভাবে ডিলাররা কিছুটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

তবে সচেতন মহলের ধারণা, এসব প্রতিষ্ঠান গুলোর অনিয়মের পেছনে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কিছু অসাধু লোকের হাত থাকতে পারে। তাছাড়া বিস্ফোরক পরিদপ্তরে লোকবল কম হলে স্থানীয় প্রশাসনকে ট্যাগ করে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা জরুরী বলে মনে করেন তারা।

অনুমোদনহীন যানবাহনে করে গ্যাস ভর্তি বোতল পরিবহনের বিষয়টির ব্যাপারে টেকনাফ ট্রফিক পুলিশের পরিদর্শক টিআই মামুনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, গ্যাস ভর্তি বোতল পরিবহন করতে গেলে যানবাহনের অনুমোদনের প্র‍য়োজন হয় এই বিষয়ে অবগত ছিলাম না। সামনে থেকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পারভেজ চৌধুরী বার্তা বাজারকে জানান, বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। আমরা এসব বিষয় গুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে এখন থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

| সুত্রঃ বার্তা বাজার |

আপনার মন্তব্য দিন