তিন বছর ১১ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ২ লাখ শিশুর জন্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক

নানা জটিলতায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে আছে। ফলে কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে ব্যাপক হারে। গত ৩ বছর ১১ মামে ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নিয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিশু। আর সন্তান সম্ভবা রয়েছে প্রায় ২৮ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা নারী। তবে প্রশাসনের দাবি, জন্ম নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পে নানা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এজন্য আগের হারে শিশু সন্তান বাড়ছে না।

বিভিন্ন সূত্রে তথ্য মতে, কক্সবাজারে আশ্রিত ৩৪ ক্যাম্পে প্রতিদিন গড়ে জন্ম নিচ্ছে ১১০-১২০ শিশু। বিপুল এই জনগণের পরিষেবা জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের প্রশাসন। আর ক্রমাগত অপরাধ কাণ্ডে জড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।

অনিয়ন্ত্রিত এই উচ্চ জন্মহার যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেখানে আমাদের দেশের জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতিতে চলমান রয়েছে ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুইটি সন্তানই যথেষ্ট’ এই ধারণা, সেখানে একেকটি রোহিঙ্গা পরিবারের সন্তানের সংখ্যা গড়ে ৫ থেকে ১০ জন। জন্মনিয়ন্ত্রণকে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের অধিকাংশই মনে করেন এটা গুনাহ পাপকাজ। তাই তারা কোনো ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন না।

উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক ইউনিসেফ কর্মী জানান, রোহিঙ্গাদের মধ্যে জন্ম নিয়ন্ত্রণে কোনো বালাই নেই। ফলে ক্রমশ বাড়ছে রোহিঙ্গাদের জন্মহার। পাশাপাশি রয়েছে বাল্যবিবাহের চলন।

সলিম মাঝির মতে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী রয়েছেন উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে। যাদের সন্তান সংখ্যা পাঁচের বেশি। এমনকি দশের বেশি সন্তানের মায়ের সংখ্যাও কম নয়। তিনি জানান, আমার এখন ৮টি সন্তান। এদের কারো বয়স ১২, ৯, ৮, ৬ ও চার বছরেরও রয়েছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি রোহিঙ্গা নারীরা মানতেই চান না বলে জানালেন ক্যাম্পে কর্মরত একাধিক স্বাস্থ্য কর্মীরা।

স্বাস্থ্য কর্মী ফরিদা আকতার বলেন, রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের মতে পরিবার পরিকল্পনা করলে গুনাহ হবে। তাই তারা ঔসবে যাবেনা । তাদের ঘরে ১০ থেকে ৮টা বাচ্ছা। তাদের দাবি এসব বাচ্চা আল্লাহ দিচ্ছে তিনিই খাওয়াবেন। ওই স্বাস্থ্য কর্মী আরও বলেন, তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণের কথা বললে তারা ক্ষেপে যান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বাস্থ্য কর্মী জানান, জন্মনিয়ন্ত্রণে কাজ করা হলেও নতুন বাচ্ছা প্রসব হলে বা গর্ভবতী রোহিঙ্গা নারীরা বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকে নানা সুবিধা পায়। ফলে তারা অধিক সুবিধা পাওয়ায় সন্তান নিয়ন্ত্রণ করার কথা মাথায় আনে না।

কক্সবাজার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. পিন্টু কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, আমার নিকট ২২ হাজার ডেলিভারির হিসাব রয়েছে ।বাকিটা ইউএনএইচআর এ জানবে তাদের নিকট এসবের পুরো ডাটা রয়েছে।

তার মতে, ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে পরবর্তী ৩ বছর রোহিঙ্গা নারীদের গর্ভধারণ হার আগের মতোই ছিল। সে হিসেবে রোহিঙ্গা নবজাতকসহ রোহিঙ্গা শিশু সন্তানদের লাখের কম নয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করার পর ২০২০-২০২১ সালে অনেক সচেতন হয়েছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ।

আমরা ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার নারীকে ইনজেকশন দিয়েছি, ৩ লাখ ১২ হাজার নারীকে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি দিয়েছি এবং ৪৮ হাজার ৫শ জনকে কনডম দিয়েছি। এছাড়া তিন বছর মেয়াদী ও ১০ বছর মেয়াদী ইনজেকশন দিয়েছি আরও ৫ হাজার জনকে।

তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতিমাসের মিটিং এ এসব বিষয় বিভাগীয় কমিশনার উপজেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবগত করি।

কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, প্রতিটি দিনই এখন আতংকের মধ্যে কাটছে। রাতে ঘুম হয় না ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। পাহাড়-পর্বত ফসলি জমি সব রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। দিনের পর দিন তাদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি তাদের অপরাধ সন্ত্রাসী কর্মকলাপের মাত্রাও বাড়ছে। তাদের অপরাধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ ভালো হবে না।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যাম্পে দায়িত্বরত কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ক্যাম্প ইনচার্জের দাবি, রোহিঙ্গাদের জন্ম নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পে নানা কার্যক্রম চলছে। এখন যেই হারে জন্মহার হচ্ছে আগামীতে তা অনেক কমে আসবে।

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণে রোহিঙ্গা নারীদের বিষয়টি বোঝানোর জন্য পরিবার ও পরিকল্পনা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ ও এনজিও সংস্থাগুলো কাজ করছে। তার মতে জন্ম হার আছে তবে তা গত ৪ বছরে ২ লাখ হবেনা। তাছাড়া ক্যাম্পে কাজ করা সংস্থাগুলো তাগিদ দেয়া আছে এ ব্যাপারে।

উল্লেখ্য যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অমানবিক নির্যাতনে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে পালিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয় প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা (প্রথম দিকের হিসেব অনুযায়ী)। এরপর পুরাতনসহ ক্যাম্প বাড়িয়ে ৩৪টি ক্যাম্প করা হয়। ইউএনএইচসিআর এর মতে বর্তমানে ক্যাম্পে তালিকাভুক্ত প্রায় ৯ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

এছাড়া উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে প্রতিবছর নতুন শিশুর জন্মের হার ৪৩ হাজার।

আপনার মন্তব্য দিন