‘দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আমি খুবই রেসপেক্ট করি’

বাংলাদেশের নাফিস বিন যাফর। অ্যানিমেটর বিশেষজ্ঞ। ফ্লুইড ও ড্রপ ডিস্ট্রাকশন টুলস আপনার আবিষ্কার। যা দিয়ে অ্যানিমেশন জগতের বিশেষ ভঙ্গি দিয়েছেন। দুই দুইবার অস্কার (একবার বিশেষ) জিতে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন রাজবাড়ীর এ যুবক। হলিউড কাঁপানো অনেক ছবিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। আছেন এখনও। যিনি কাজের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকা সম্মুখপানে নিয়ে চলেছেন।
‘‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান: অ্যাট ওয়ার্ল্ড’স এন্ড’’, ‘‘মাদাগাস্কার থ্রি: ইউরোপ’স মোস্ট ওয়ান্টেড’’, ‘পুস ইন বুটস’, ‘কুংফু পাণ্ডা টু’, ‘মেগামাইন্ড’, ‘শ্রেক ফরেভার আফটার’, ‘পার্সি জ্যাকসন অ্যান্ড দ্য লাইটেনিং থিফ’, ‘দ্য সিকার: দ্য ডার্ক ইজ রাইজিং’, ‘ফ্ল্যাগস অব আওয়ার ফাদার স্টিল্‌থ্‌’, ‘দ্য ক্রুড’- ছবিগুলোতে তার কাজ প্রশংসিত।
১৬ বছর ধরে হলিউডে কাজ করছেন নাফিস। তিনি এখন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ড্রিমওয়ার্কস অ্যানিমেশনে কর্মরত আছেন। এর অন্যতম মালিক সেলুলয়েডের জাদুকর স্টিভেন স্পিলবার্গ।
সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে এসেছেন ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’-এ অংশ নিতে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চলা এ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে (৭ডিসেম্বর) অংশ নেন তিনি। এরপর বিকালে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত আরেকটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন নাফিস। ‘এসিএম সিগগ্রাফ বাংলাদেশ’ নামের এ আয়োজনে অংশ নেওয়ার আগে একান্ত কিছু সময় কথা বলেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে। তার কথোপকথনের অংশ বিশেষ থাকছে পাঠকদের জন্য-

প্রশ্ন: অনেকদিন পর দেশে এলেন। কেমন লাগছে?
নাফিস বিন যাফর: এটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। খুবই ভালো। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হয়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ কতটা এগিয়ে গেছে, কেমন করছে- ছবি নিয়ে আপনার কোনও মন্তব্য কি পাব?
যাফর: এটা আসলে আমার ফিল্ড নয়। আমার জায়গাটা হলো আমেরিকার ফিল্ম নিয়ে। আমার মন্তব্য করাটা মনে হয় ঠিক হবে না।
তবে আমার কাছে বাংলাদেশসহ অন্য সব দেশের ছবি ভালোই লাগে। কারণ তারা নিজেদের গল্পটা বলছে। বাংলাদেশের ছবি নিয়ে গভীরভাবে বলতে পারব না। আর আমি যদি বাইরে থেকে এসে হুট করে মন্তব্য করি, সেটা ঠিকও হবে না।
এটা সত্য, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আমি খুবই রেসপেক্ট করি । তারা সুন্দর করে এগিয়ে যাচ্ছেন। সঙ্গে এটাও বলতে চাই, যেটা আমি সবসময় বলি- ফিল্ম তৈরির আগে যদি টিকিট বিক্রির চিন্তা মাথায় থাকে তাহলে ভালো ফিল্ম নির্মাণ করা সম্ভব নয়। ফিল্ম তৈরি শেষ হলেই টিকিট বিক্রির চিন্তা করতে হবে। টিকিটের টাকা দিয়েই পরবর্তী ফিল্মের ফান্ড তৈরি হবে।
প্রশ্ন: যদি একজন দর্শক হিসেবে বলতে বলি।
যাফর: হ্যাঁ, তাহলে বলা যায়। বাংলাদেশে কিন্তু মজার বা ফ্যানি বেশ কিছু কাজ হয়েছে। এ সেক্টরে ভালো এফোর্ট হয়েছে।
এখন ইন্টারনেটে অনেক বেশি দেখা যায়। ফিল্মে ইন্টারেস্ট থাকলে দেশের তরুণ নির্মাতারা এগুলো কিন্তু দেখতে পারেন। এখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। এতে করে তারা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ভাব বা সংস্কৃতিতে ঢুকতে পারেন। আমার মনে হয় নতুন নির্মাতাদের এ জায়গায় আরও যুক্ত হতে হবে।
প্রশ্ন: এ দেশে অ্যানিমেশন সম্ভাবনা কতটুকু। অ্যানিমেশন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা সম্ভব কিনা?
যাফর: সম্ভব কিনা তা বলাটা কঠিন। যেমন ভবিষ্যতের পৃথিবী বা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি কী হবে, আমেরিকায় এই গবেষণা অনেক আগেই হয়েছিল। যার ফল আজকের ইন্ডাস্ট্রি। মানে তারা কিন্তু আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। এটা টেকনিকের কথা বলছি। আর অ্যানিমেশনের কথা যদি বলি, এটা শুরু হয়েছে ওয়ার্ল্ড ডিজনির মাধ্যমে।
এটা ছিল ফান্ডামেন্টাল কাউন্টার অ্যানিমেশন। বিষয়টা কম্পিউটারে হচ্ছে, না হাতে হচ্ছে ওটা ফ্যাক্ট না।
এখন বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে, মানুষ দেখতে চাচ্ছে কিনা। আগ্রহটা আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রি সম্ভব। এটাও ফান্ডামেন্টাল বিষয়।
প্রশ্ন: আপনি একজন বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অবদান রাখার ইচ্ছে আছে?
যাফর: এ প্রশ্নটা সব সময়ই আসে। সত্য কথা হলো, এ দেশের ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমি চাইলেও করতে পারব না। আমার ক্লায়েন্টও কিন্তু এখানে নাই! তাই কতটা অবদান রাখার সুযোগ আছে, তা কিন্তু নিশ্চিত নয়।
প্রশ্ন: ফ্লুইড অ্যানিমেশন ও ড্রপ ডিস্ট্রাকশন অ্যানিমেশন টুলস আপনার আবিষ্কার। এর জন্য আপনি বিশ্বজোড়া সমাদৃত। এ জন্য আপনি অস্কারও পেয়েছেন। যখন দেখলেন আলাদা কিছু করতে পেরেছেন, তখন কেমন লাগছিল?
যাফর: না না, এটা অনুভূতি বিষয় না। আমি কিন্তু নিউক্লিয়ার ফিজিক্স করছি না (হাসি)। এটা অনেক বছর ধরে আমি চর্চা করছি। কাজ করতে করতে হয়েছে। পরে এটা ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এ প্রয়োগ হয়। যখন অস্কার পেলাম তখনই সবাই বিষয়টি জানতে পারল!
প্রশ্ন: দীর্ঘদিনের বিরতিতে বাংলাদেশে সেশন করলেন। প্রশ্নগুলো কেমন ছিল?
যাফর: অভিজ্ঞতা অবশ্যই ভালো ছিল। খুব টেকনিক্যাল প্রশ্নও পেয়েছি। আবার মজার প্রশ্নও পেয়েছি।
প্রশ্ন: দেশে থাকছেন কয়দিন?
যাফর: আমি আগামী পরশু (৯ ডিসেম্বর) চলে যাব।
প্রশ্ন: অনেকেই আপনার মতো অ্যানিমেটর হতে চায়। সেই সব তরুণদের আপনি কী বলবেন?
যাফর: হতাশ হওয়া যাবে না। শুরুতে যে কাজ করতে আমার এক মাস লেগেছে, পরবর্তীতে সেই একই কাজ আমার করতে কয়েক মুহূর্ত লেগেছে। তাই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আগ্রহ ধরে রাখতে হবে।
গ্রাফিক্স বা অ্যানিমেশন নিয়ে কাজ করতে হলে তিনটি বিষয় একজন মানুষের মধ্যে থাকতেই হবে। এগুলো হলো প্রচণ্ড ধৈর্য, ইচ্ছেশক্তি ও কাজের প্রতি ভালোবাসা। এগুলো না থাকলে কোনওভাবেই ভালো করা যাবে না।
আপনারা যদি এই সেক্টরে কাজ করতে চান তবে থিয়েটারে কাজ করুন। নাটকে কাজ করুন। প্রথমে ছোট গল্প তৈরি করুন, শর্ট ফিল্ম বানান। প্রয়োজনে টিভিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন। এসব কাজ করতে করতে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার কোন কাজটা ভালো লাগে। একটা নাটক কিংবা ছবিতে শুধু ক্যারেক্টার ছাড়াও পেছনে অনেক কিছু থাকে। সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে। না হলে ভালো ফিল্ম মেকার হওয়া যাবে না।
প্রশ্ন: শুরুর গল্পটা দিয়ে কি শেষ করতে পারি? কেমন ছিল আপনার শুরুটা?
যাফর: অবশ্যই। আমি ছিলাম একা, শুরুও করেছিলাম একা। আর এখন আমি ৫০০ সদস্যের বড় একটি টিমকে নেতৃত্ব দিই।
১৯৮৯ সালে ১১ বছর বয়সে আমেরিকায় পাড়ি জমাই। সেখানে কলেজ অব চালুসট থেকে সফটওয়্যার প্রকৌশল শাখায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি। এরপর সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছি মেডিকেল ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনায়। দুই বছর পর চলে যাই স্পেশাল ইফেক্ট তৈরির জন্য জেমস ক্যামেরনের ডিজিটাল ডোমেইনে। ২০০০ সাল থেকে যুক্ত হই সিনেমা জগতে। এরপরের ঘটনা তো আপনাদের জানা।

আপনার মন্তব্য দিন