‘বলিউড যদি যৌন নিগ্রহ নিয়ে মুখ খোলে, বহু নায়কের কপালে দুঃখ আছে’

হলিউডের মতো যৌন নিগ্রহের বিরুদ্ধে #মিটু প্রতিবাদ আন্দোলনের পথে এখনই হাঁটতে পারবে না বলিউড। কারণ এ দেশে অপরাধের শিকারকেই মূলত ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়। বললেন বলিউড অভিনেত্রী রিচা চাধা।

তারপরেই রিচার বিস্ফোরক উক্তি, সত্যিই যদি বলিউডে তা ঘটে, তবে গোটা শক্তির ইমারতই মুহূর্তে বদলে যাবে। আমরা যাদের দেখি নারীবাদী ছবি করতে, নিজেদের আধুনিক বলে দাবি করতে, অস্তিত্ব ধসে পড়বে তাদের।

হিন্দুস্থান টাইমস লিখেছে, রিচা বলেছেন, শুধু তাই নয়, অনেক নায়ককে হারাব আমরা, বহু লোক তাদের রুটিরুজি খোয়াবেন, হারাবেন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া প্রতিপত্তি। আর্থিকভাবে তাদের ক্ষতি করা সম্ভব নয়, তাই আক্রান্ত হবে ওই উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া নাম, খ্যাতি।

হলিউডের মতো এখনই যৌন নিগ্রহ নিয়ে সরব হওয়া সম্ভব নয় নারীপুরুষ নির্বিশেষে বলিউডের কলাকুশলীদের। রিচার মতে, মানসিক আঘাত তার যেমন একটা কারণ, অন্য কারণ হল, জীবিকার পথ বন্ধ হওয়া। অথচ হলিউডে পরিস্থিতি এমন নয়, শিল্পীরা সেখানে রয়্যালটি পান। তবু তাঁর ধারণা, আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে তা ঘটবে। নিজের ওপর ঘটা নির্যাতন নিয়ে সরব হওয়ার সাহস দেখাবে বলিউড।

কৃষ্ণাঙ্গ নারী তারানা বুর্কে ২০০৬ সালে যৌন নির্যাতনবিরোধী ‘মি টু’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন৷ এরপর হলিউডের প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের যৌন কেলেঙ্কারির খবর ফাঁসের সূত্র ধরে মার্কিন অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো ‘মি টু’ হ্যাশট্যগের এই প্রচারণা শুরু করেন আবারো৷ যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা প্রকাশ করতে নারীদের উৎসাহিত করতে এ প্রচারণা দ্রুত জনপ্রিয় হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে৷

একসময় যৌন নিপীড়নবিরোধী এই প্রচারণায় নারীদের পাশাপাশি যোগ দেয় পুরুষেরাও৷ সামাজিক মাধ্যমে ভাগাভাগি করেন তাদের যৌন হয়রানির কথাও৷ তারানা বুর্কে বলেন, ‘আমি কখনোই ভাবিনি যে, সারা পৃথিবীকে বদলে দেবার মতো কিছু করছি৷ আমি শুরু আমার নিজের সমাজকে পাল্টাতে চাইছিলাম৷ এটা কেবল একটা মুহূর্ত নয়, এটা একটা আন্দোলন৷ এখন সত্যিকার অর্থেই কাজ শুরু হয়েছে৷’

বলিউডের আনাচে কানাচে বহু ওয়েনস্টাইন, প্রিয়ঙ্কার পর মুখ খুললেন রিচা চাধা
বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জানিয়েছেন, নায়িকাদের যৌন নিগ্রহে অভিযুক্ত হার্ভে ওয়েনস্টাইনরা শুধু হলিউডে নয়, বলিউডেও ছড়িয়ে আছেন। এবার একই কথা বললেন আর এক অভিনেত্রী রিচা চাধা। তার অভিযোগ, বলিউডে কাজ করতে আগ্রহী মেয়েদের নিয়মিত অসংখ্য ওয়েনস্টাইনের মুখোমুখি হতে হয়। যতদিন না তারা নিজেদের পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পান, ততদিন সয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই।

রিচার কথায়, যেভাবে আমরা নিঃশ্বাস নিই, তেমনই স্বাভাবিকভাবে বলিউডে যৌন নিগ্রহ ঘটে। কিন্তু মুখ বুজে থাকা ছাড়া উপায় নেই, নাহলে কাজ মিলবে না।

সামনেই মুক্তি পাচ্ছে রিচার আগামী ছবি ফুকরে রিটার্নস। তার দাবি, ছবির প্রচারের জন্য তিনি সময় বেছে এখনই এ ধরনের মন্তব্য করেছেন ভাবলে ভুল হবে। কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনো বরং বলুন, এতদিন তিনিই বা চুপ করেছিলেন কেন। কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনো হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক, যিনি স্বীকার করেছেন, তার বান্ধবীসহ বহু অভিনেত্রী ওয়েনস্টাইনের বিরুদ্ধে তার কাছে অভিযোগ করা সত্ত্বেও তার সঙ্গে কাজ করে গিয়েছেন তিনি।

রিচা অবশ্য বলেছেন, তার নিজের সঙ্গে ঘটেছে এমন কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার কথা বলেননি। তবে তার অভিযোগ, অল্পবয়সী, উঠতি অভিনেত্রীরা ক্ষমতাসীনদের হাতে নিয়মিত নিগ্রহ সহ্য করেন। ফলে তারা নিজেরাই একে অপরকে সাবধান করেন, বলে দেন, কার কাছাকাছি গেলে বিপদ হতে পারে। এভাবেই বলিউডের মেয়েরা বাঁচিয়ে চলেন নিজেদের।

তার বক্তব্য, অপরাধীদের চিহ্নিত করে মুখোশ খুলে দেওয়া উচিত। অপরাধের যিনি শিকার, তাকে লজ্জা দেওয়া বন্ধ করা হোক। দেখা হোক, মেয়েরা যাতে সম্মানের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারেন, যাতে তাঁদের অপমানিত না হতে হয়।

তবে ৫০ বা ৬০-এর দশকের থেকে এখন বলিউডে যৌন নিগ্রহ কমেছে বলে তার দাবি।

মৌনতা ভঙ্গকারীরা টাইম ম্যাগাজিনের ‘সেরা ব্যক্তিত্ব’
যৌন অত্যাচার এবং নিগ্রহের বিষয়ে বিশ্বব্যাপী যারা মৌনতা ভঙ্গ করেছেন তাদের সাহসিকতার স্বীকৃতি দিয়ে ইংরেজি সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিন তাদের বছরের সেরা ব্যক্তিত্বের মর্যাদা দিয়েছে।

‘নৈশব্দ ভঙ্গকারী’ এই শিরোনাম দিয়ে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক এই সাময়িকী বলছে, তারা একযোগে যে ক্রোধ প্রকাশ করেছেন তার ফল হয়েছে তাৎক্ষণিক এবং স্তম্ভিত হয়ে যাওয়ার মতো।

বিভিন্ন দেশে রাজনীতি, ব্যবসা, শিল্প-সংস্কৃতির জগতের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি যৌন অত্যাচারের অনেকগুলো অভিযোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন বেশ কয়েকজন নারী এবং পুরুষ।

হলিউডের শীর্ষ একজন প্রযোজক হার্ভে ওয়েন্সটেইনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ থেকে শুরু হয়েছিল মৌনতা ভঙ্গের এই পালা।

তারপর প্রধানত টুইটারে মি-টু হ্যাশট্যাগে একে একে অনেক নারী এবং বেশ কয়েকজন পুরুষও নাম করা এবং প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেন। টাইম ম্যাগাজিন সেই সাহসিকতার স্বীকৃতি দিল।

পত্রিকার প্রধান সম্পাদক এডওয়ার্ড ফেলসেনথাল বলেছেন, “গত কয়েক দশকের মধ্যে এত দ্রুততার সাথে কোনো সামাজিক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত এই প্রথম।”

সাহস করে এগিয়ে এসেছেন এমন কয়েকজন নারীর ছবি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা পেয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাশলে জুড। হার্ভে ওয়েন্সটেইনের বিরুদ্ধে যে সব নারীরা প্রথম মুখ খুলেছিলেন তিনি তাদের একজন।

পপ তারকা টেইলর সুইফটও রয়েছেন টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে। আরও রয়েছেন মেক্সিকোর ৪২ বছর বয়স্ক খামার কর্মী ইসাবেল পাসকুয়াল (আসল নাম নয়) এবং উবারের সাবেক প্রকৌশলী সুজান ফাউলার যিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন।

টাইম ম্যাগাজিন লিখেছে, “যেসব নারী এবং পুরুষ তাদের মৌনতা ভেঙ্গেছেন তারা নানা শ্রেণী, বর্ণ, পেশা এবং বিশ্বের নানা দেশের।”

“কিন্তু এরা সবাই একসাথে মিলে লজ্জাকে ক্রোধে রূপান্তর করেছেন, পরিবর্তনের জন্য হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন, এবং অত্যন্ত ক্ষমতাধর কিছু মানুষকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করেছেন।”

১৯২৭ সাল থেকে টাইম ম্যাগাজিন বছরের সেরা ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত করছে। অনেকদিন পর্যন্ত শুধু একজন ব্যক্তিকে এই সম্মান দেওয়া হতো, তবে সাম্প্রতিক সময়ে মহৎ কোনো কাজের সাথে জড়িত একাধিক ব্যক্তিকে সমষ্টিগতভাবে এই সম্মান দেয়া হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য দিন