সোমবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
Homeরোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনবাড়ছে নিরাপত্তা হুমকি

বাড়ছে নিরাপত্তা হুমকি

সমকাল

রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর নজিরবিহীন বর্বরতা চালায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এর পর ওই বছরের ২৫ আগস্ট থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে। এ ঘটনার পর ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারে ঠাঁই নেয়। এর আগেও কয়েক দশকে অন্তত ৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। এ ছাড়া প্রতি বছর ক্যাম্পে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে। সব মিলিয়ে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নিয়ে এখন আর্থসামাজিক চাপে বাংলাদেশ। এই রোহিঙ্গাদের ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে। মাদক, অস্ত্র, চোরাচালান, খুনোখুনিতেও জড়াচ্ছে রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ। কক্সবাজার জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নানা অপরাধের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২ হাজার ৩৬৩টি। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪ হাজার ৯৭৯ জনকে।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) নেতা মো. জোবায়ের ২৫ আগস্টকে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘কালো দিন’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতির কথাও জানান।

উখিয়ার একাধিক রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিয়ানমারভিত্তিক সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) নাম ভাঙিয়ে একটি গ্রুপ সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রত্যাবাসনবিরোধী মনোভাব উস্কে দিচ্ছে।
খুনোখুনিসহ ক্যাম্পের বিভিন্ন অপরাধের পেছনে তারাই মূল ভূমিকা পালন করছে।

সর্বশেষ ৯ আগস্ট উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। ক্যাম্প ১৫-এর ব্লক সি/১-এর আব্দুর রহিমের ছেলে প্রধান মাঝি আবু তালেব ও একই ক্যাম্পের সি/৯-এর ইমাম হোসেনের ছেলে সাব ব্লক মাঝি সৈয়দ হোসেনকে খুন করা হয়। এর তিন দিন পর একই ক্যাম্পে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাতে মহড়া দেয় একটি গ্রুপ।

কক্সবাজারের উখিয়ার জামতলীর ১৫ ক্যাম্পের রোহিঙ্গা মাঝি আবদুল বাছের। স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান মিলে বাছেরের সংসার। মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পাঁচ বছর আগে মংডুর বুছিডং এলাকা থেকে পরিবারের ৫ সদস্য নিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এর পর ক্যাম্পে তাঁর ঘরে আসে দুই নতুন অতিথি। গতকাল বুধবার বাছের সমকালকে বলেন, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজ মাটিতে ফিরতে চাই। বিপদের সময় বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। এ জন্য কৃতজ্ঞ। আমরা এখানে বছরের পর বছর থাকতে আসিনি। বাপ-দাদার মাটিতে কে না ফিরতে চায়!’ তিনি বলেন, ‘একটি গ্রুপ আছে; আরসা পরিচয় দিয়ে ক্যাম্পে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করছে। তারা মাঝি ও সাব মাঝিদের শত্রু মনে করছে। অপরাধী ওই চক্রের ধারণা, ক্যাম্পের দুষ্টু লোকদের সব তথ্য প্রশাসনকে মাঝিরা জানিয়ে দিচ্ছেন। এ কারণে তাদের বাণিজ্যের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নারী দেখলেই কিছু লোক তাদের বিরক্ত করে। জোর করে সম্পর্ক করতে চায়। ক্যাম্পের ভেতরে কোনো ঝামেলা তৈরি হলে তারা টাকার বিনিময়ে বিচার-সালিশ করতে আগ্রহী। অনেক সময় রাতে ক্যাম্পে তারা মহড়া দেওয়ার চেষ্টা করে। সাধারণ রোহিঙ্গা দলবদ্ধ হয়ে ছোট ছোট গ্রুপে নিজের এলাকা নিজেরা রাতে পাহারা দিচ্ছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামতলী ক্যাম্পে যারা আরসা পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছে মাহমুদুল হাসান, জাফর আহমদ, জোবায়ের, মো. রশিদ, খালেক, মৌলভি ইছমাইল, মো. নূর ও নূর বশার। এই চক্রের কাছে খালেক ‘ওস্তাদ খালেক’ নামে পরিচিত। তাকে সবাই ‘গুরু’ হিসেবে মান্য করে। জামতলী ছাড়াও জিরো পয়েন্ট এলাকায় রয়েছে তার যাতায়াত। তবে আরসা পরিচয়ে যারা আতঙ্ক তৈরি করছে, তারা গোপনে গোপনে ক্যাম্পে আসে। অনেক সময় পাহাড়ের গহিন এলাকায় তারা গা-ঢাকা দেয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছুদিন ধরেই সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিয়ে রাতে টহল টিম তৈরি করা হয়েছে। পালাক্রমে লাঠি নিয়ে তারা রাতভর নিজেদের আঙিনার নিরাপত্তা দিচ্ছে। ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থাপনার এই ধারণার প্রবক্তা হলেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের এডিসি রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, স্বেচ্ছা পাহারা ব্যবস্থা এখন সব ক্যাম্পে চালু রয়েছে। এতে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে সাহস সঞ্চার হয়। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার আভাস পেলেই সাধারণ রোহিঙ্গারা গিয়ে তা প্রতিরোধ করে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অবস্থান করলে তাদের সঙ্গে নিজস্ব জাতিগত সত্তা হারিয়ে এখনকার পরিবেশের সঙ্গে এক ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মিথস্ট্ক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। অনেক রোহিঙ্গা বাঙালিদের সঙ্গেও মিশে যাচ্ছে। কেউ কেউ গোপনে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিচ্ছে। অনেক রোহিঙ্গা বাঙালি পরিচয়ে চাকরি নিচ্ছে। ক্যাম্পের বাইরে এসে ভাড়া বাসায় থাকছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা ও তাদের অধিকার আদায়ের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর থেকে নিহতের পরিবারের সদস্যরা আরসাকে দায়ী করে আসছিলেন। এরপর ২২ অক্টোবর ১৮ নম্বর ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে গুলি করে ছয় ছাত্র-শিক্ষককে হত্যা করা হয়। গত ১ আগস্ট উখিয়ার মধুরছড়ায় নুরুল আমিন নামে এক রোহিঙ্গা যুবক খুন হন। ২২ জুন মোহাম্মদ শাহ ও ১৫ জুন মো. সেলিম নামে দু’জন গুলিতে নিহত হন। একই মাসে ১০ জুন কুতুপালংয়ের চার নম্বর ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবক মোহাম্মদ সমিন ও ৯ জুন রোহিঙ্গা নেতা আজিম উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
মোহাম্মদ জুবাইয়ের। কক্সবাজারের কুতুপালংয়ের দুই কিলোমিটার ভেতরে লম্বশিয়া ক্যাম্পে বসতির তাঁর। ‘রিফুজির জীবন অশান্তির, আর থাকতে চায় না রিফুজি হয়ে।’ কেমন আছেন- প্রশ্নের উত্তরে এই কথাটি বললেন মংডুর হোয়াইচ্ছা গ্রাম থেকে আসা জুবাইয়ের।

মিয়ানমার সেনাদের হাতে স্বামী জমির আহমদ খুন হওয়ার পর রাখাইনের মংডুর কাওয়ারবিল থেকে অনেকের সঙ্গে পালিয়ে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে কক্সবাজার চলে আসেন রশিদা বেগম। সে যাত্রায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন তিন সন্তানও। আশ্রয় মেলে কক্সবাজারের উখিয়া বালুখালী ক্যাম্পে। পাঁচ বছর আগে প্রাণে বাঁচতে, নিরাপদ জীবনের আশায় যে পালানোর শুরু হয়েছে রশিদার জীবনে তা যেন আর শেষ হতে চাচ্ছে না। রশিদা বেগম বলেন, ‘কবে দেশে ফিরতে পারবো এই দিন গুনছি। দেশে মাটিতে ফিরতে চাই।’

জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধের ঘটনায় মোট ২ হাজার ৩৬৩ মামলার মধ্যে অস্ত্রের ১৭৯টি, মাদকের ১ হাজার ৬০১টি, নারী নির্যাতনের ৮৪টি, ফরেনার্স অ্যাক্টে ৪০টি, অপহরণের ৩৯টি, বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৬৬টি, ডাকাতির ৭১টি, খুনের ৯৫টি, মানব পাচারের ৩৩টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া অন্য ধারায় আরও ১৫৫টি মামলা করা হয়। এ ছাড়া পাঁচ বছরে ক্যাম্প থেকে ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ পিস, গাঁজা ৭৩ কেজি, ক্রিস্টাল মেথ ৮ কেজি ৯০ গ্রাম, দেশি পিস্তল ২৩টি, বন্দুক ৩৯টি ও ৮০৭ রাউন্ড গুলি।

ইউএনডিপির এক গবেষণায় দেখা যায়, কক্সবাজারের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছে, তারা রোহিঙ্গাদের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টেকনাফের হ্নীলার নয়াপাড়ার বাসিন্দা আবুল হাসিম। পাঁচ বছর আগে জাদিমুরা যেখানে এখন শালবন রোহিঙ্গা শিবির গড়ে উঠেছে, সেখানে তিনি চাষবাস করে সংসার চালাতেন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারে ১২ সদস্য। এখন তাদের নিয়ে খুব কষ্টে জীবন পার করছি। এখানে কাজ পাওয়া কঠিন। কারণ রোহিঙ্গাদের ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দিয়েই কাজ করানো যায়। তাই তাদেরই সবাই কাজে লাগায়। রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।’

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সংকটে সাড়াদান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০২২ সালের জন্য ৮৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের আবেদন ছিল। বছরের আট মাসে চাহিদার ৪২ কোটি ৬২ লাখ ডলারের অনুদান পাওয়া গেছে, যা চাহিদার মাত্র ৪৯ শতাংশ। ২০২১ সালে চাহিদার ৮০ শতাংশ বা ৭৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলার এসেছিল। ২০২০ সালে ছিল ১০৬ কোটি ডলার চাহিদার প্রায় ৭৬ শতাংশ বা ৮০ কোটি ৬৭ লাখ ডলার জোগাড় করতে পেরেছে জাতিসংঘ। ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য ৯২ কোটি ডলারের চাহিদার ৯১ শতাংশ অর্থ জোগাড় করতে পেরেছিল জাতিসংঘ। ২০১৮ সালে ৯৫ কোটি চাহিদার সাড়ে ৮২ কোটি ডলার পাওয়া গিয়েছিল, যা সেই বছরের জোগাড় হয় চাহিদার প্রায় ৮৭ শতাংশ। ২০১৭ সালে চাহিদা ছিল ৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। জাতিসংঘ ওই বছর জোগাড় করে ৫৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলার।

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments