যেসব কারণে ধুঁকছে কক্সবাজার নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ

সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার

পর্যটন নগরীতে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে দক্ষ নার্স তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় কক্সবাজার নার্সিং ইনস্টিটিউট। দীর্ঘ ২৭ বছরের পথপরিক্রমায় সেই প্রতিষ্ঠানের নাম এখন ‘কক্সবাজার নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ’। অ্যাকাডেমিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির উন্নতি হলেও দীর্ঘ অর্ধযুগেরও বেশি সময় ধরে বহুমুখী সমস্যায় ধুঁকে ধুঁকে চলছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। সেবাপ্রার্থী ও চিকিৎসকরা বলছেন, কলেজটি যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে কার্যত লাইফ সাপোর্টেই চলে গেছে।

সূত্র বলছে, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পশ্চিম পাশে প্রায় ৮০ শতক জমি নিয়ে লাইব্রেরি, শ্রেণীকক্ষ ও কার্যালয় মিলে দ্বিতলবিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ও তিন তলার হোস্টেল ভবন নিয়ে চলছে ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম। রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক, শিক্ষক ও অন্যকর্ম জীবীদের আবাসন ব্যবস্থা। ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সাইন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারির একটি  কোর্সে ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রাকরা ইনস্টিটিউটের তিনটি বর্ষে ১২০ জন শিক্ষার্থীর কথা মাথায় রেখে ২৪ জনকে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। 

প্রতিতলায় ১০টি করে তিন তলায় ৩০টি কক্ষে হোস্টেলে প্রায় ১২০জন শিক্ষার্থী অবস্থানের সুযোগ রয়েছে। ধীরে ধীরে কর্মপরিধি ও শিক্ষার্থী বেড়েছে। এখন ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সাইন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি ছাড়া, ‘ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি’-কোর্স আসায় ইনস্টিটিউট থেকে এটি রূপান্তর হয়েছে কলেজে। ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সাইন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কোর্সের (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়) প্রতি বর্ষে ৫০ জন করে ১৫০ ভর্তি হচ্ছে। এছাড়া, নতুন চালু হওয়া ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি- কোর্সে ২৫ জন শিক্ষার্থী চলতি সেশনে ভর্তি হচ্ছে। এতে এখন কলেজে নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ১৭৫ জন।

কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি জনবল ও সুযোগ-সুবিধা। বরং প্রথম অনুমোদন পাওয়া জনবলের ২৪ জনের সিংহভাগ পদই খালি। একজন নার্সিং ইনস্ট্রাক্টর ইনচার্জ, দুজন ইনস্ট্রাক্টর (শিক্ষক), একজন হাউজ কিপার, একজন কোষাধ্যক্ষ পদে লোকবল পূর্ণ থাকলেও তিন জন এমএলএসএস রয়েছেন একজন, দুজন ক্লিনারের পদে আছেন একজন, তিনজন দারোয়ানের পদ থাকলেও রয়েছেন দু’জন। এদিকে, একজন মালির পদ থাকলেও তা শূন্য। উচ্চমান সহকারির পদ আছে, তবে কোনো লোক নেই। অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক থাকার কথা থাকলেও কোনো লোকবল নেই। তিন জন এমএলএসএস থাকার কথা থাকলেও রয়েছে একজন, তিন জন মশালচির মাঝে একজনের পদ খালি, দুজন টেবিল বয় কাজ করেন প্রেষণে। প্রতিষ্ঠান ও ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে দুজন ঝাড়ুদারের মাঝে একটি পদ শুরু থেকেই শূন্য। দফতরির পদ রয়েছে একটি। তাও খালি। 

রান্নাঘর সংশ্লিষ্ট পদগুলোর অধিকাংশ খালি থাকায় হোস্টেলে থাকা শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য রান্নায় পালাকরে শিক্ষার্থী ও বাইরের দু’নারীকে ডে-পারিশ্রমিকে এনে কাজে সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাউজকিপার শিখা দত্ত।

কিন্তু বর্তমানে দৈনিক ভিত্তির সেই লোকবলও নেই। নেই রান্নাঘরের পরিবেশও। রান্না ঘরের ছাদ ছুঁইয়ে পানি পড়ে জলন্ত চুলায়। এই সমস্যা সমাধানে সিমেন্টের ছাদের নিচে পলিথিনের চালা দেওয়া হয়েছে। এখন সেই দেয়াল ছুঁইয়েও পানি ঝরছে। এরফলে সারাক্ষণই মেঝে থাকে স্যাঁতস্যাঁতে।

শিক্ষার্থীদের মতে, এত অপ্রাপ্তির মাঝেও স্বাস্থ্য সেবায় নিজেদের প্রশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে হোস্টেলে থাকলেও বৃষ্টি হলেই অনেক কক্ষে ঘুমানো যায় না। বারান্দায় শুকাতে দেওয়া যায় না কাপড়। ছাদের পলেস্তেরা ছুঁইয়ে ভেতরে পড়ে পানি। শ্রেণী কক্ষেও রয়েছে একই সমস্যা। ছাদ ছুঁইয়ে আসা পানি ফ্যান ও লাইটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। না বুঝে এসময় সুইচ টিপলেই ঘটছে শর্টসার্কিটের ঘটনা। ভেঙে গেছে অধিকাংশ জানালার কাঁচ, ক্ষয়ে গেছে লোহার ফ্রেম। আটকে থাকছে টয়লেটের ময়লা ও বাথরুমের পানি। ভাঙা জানালার কারণে বেড়েছে চোরের উপদ্রব। বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ইপিআই কেন্দ্রের সাইডের জানালাগুলো ভাঙা থাকায় এসব দিক দিয়ে মুঠোফোন, কাপড়সহ মূল্যবান জিনিস চুরি হয়ে যাচ্ছে। 

সম্প্রতি দুপুরে কক্সবাজার নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ (নার্সিং ইনস্টিটিউট) গিয়ে দেখা যায়, পুরো প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাডেমিক ভবন, হোস্টেল ও আবাসিক ভবনের কোথাও বিদ্যুৎ নেই। বৃষ্টির মাঝে সুইচ দিতে গিয়ে কয়েকটি লাইট, ফ্যানে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে পুরো প্রতিষ্ঠান বুধবার সন্ধ্যা হতে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা। অ্যাকাডেমিক ভবনের ক্লাসরুম-২ এ ছাদ ছুঁয়ে ফ্যান বেয়ে পানি পড়ে মেঝে ভিজে গেছে। হোস্টেলের নিচতলার পূর্বপাশের বারান্দায় একইভাবে ছাদ ছুঁইয়ে পানি পড়ে একাকার। একইভাবে পানি পড়ছে রান্নাঘরেও। সেখানে পলিথিনের চালা টানিয়ে বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষার চেষ্টা চলছে জলন্ত চুলা। হোস্টেলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ৭-৮টি রুমে একইভাবে ছাদ ছুঁইয়ে পানি ঝরছে। ছাদ ছুঁইয়ে পানি পড়ায় অধিকাংশ রুমের ফ্যান ও লাইট নষ্ট হয়ে গেছে।  ১৫-২০টি রুমের জানালার আয়না ভাঙা।

কক্সবাজার নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ’র নার্সিং ইনস্ট্রাক্টর ইনচার্জ করুনা রানী বেপারী বলেন, ‘এ দুঃখ দীর্ঘদিনের। ছাদ ছুঁইয়ে পানি পড়ায় ফ্যান-লাইটের লাইন ভিজে যাওয়ায় সুইচ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বিদ্যুতায়িত হয়ে ভবনে বৈদ্যুতিক গোলযোগের ঘটনা ঘটছে বার বার।’ তিনি আরও বলেন, ‘জনবল পূরণে সংশ্লিষ্ট বিভাগে বারবার চিঠি দিয়েও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।  ভবনের দৃশ্যমান সমস্যাগুলো সারাতে ২০১৯ সালেই গণপূর্ত বিভাগে চাহিদা  দেওয়া হয়। কিন্তু মূল কাজগুলো রেখে ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষ সময়ে অপ্রয়োজনীয় কিছু কাজ করেছে গণপূর্ত। সেসব কাজ না করে ছাদের পানি ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফ্যান-লাইটগুলো ঠিক করতে বললেও তারা কর্ণপাত করেনি।’

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা কক্সবাজারে কাজ শুরু করেছি গতবছর। কক্সবাজার নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ থেকে কাজ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।  মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে কাজের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহি প্রকৌশলী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ীই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করা হয়।’ কক্সবাজার নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।  ইত্তেফাক

আপনার মন্তব্য দিন