সোমবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
Homeরোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনরোহিঙ্গা ঢলের ৫ বছর: শুধু কথা হলো, ফেরা হলো না

রোহিঙ্গা ঢলের ৫ বছর: শুধু কথা হলো, ফেরা হলো না

আজকের পত্রিকাঃ

নিজের মাকে পিঠে নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে বাংলাদেশে ঢুকেছিলেন মিয়ানমারের রাখাইনের বাসিন্দা আবদুল হালিম (৩০)। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার কিছুদিন পরই মাকে হারিয়েছেন। আশায় আশায় ছিলেন, দিন কয়েক পরই হয়তো আবার ফিরতে পারবেন নিজেদের ঠিকানায়। ফেরা নিয়ে অনেক আশার কথা শুনছেন পাঁচ বছর ধরে। কিন্তু নিজ দেশের পথে পা বাড়ানো আজও হলো না।

‘মিয়ানমার সরকার আমাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। শিশুদের পুড়িয়ে মেরেছে। আমাদের মা-বোনেরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বিচার হচ্ছে, হবে শুনছি। কিন্তু এখনো হয়নি। আশা ছিল, বাড়ি ফিরব। তা-ও হলো না।’ বলছিলেন আবদুল হালিম।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু করে সে দেশের সেনাবাহিনী। প্রাণে বাঁচতে বন-পাহাড় ডিঙিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশও মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেয়। তাদের নিজ দেশে ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এরপর দুই দফা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে প্রত্যাবাসন শুরু করতে। কিন্তু ‘ফেরার পরিবেশ তৈরি হয়নি’ অজুহাতে সেই চুক্তির আওতায় গত পাঁচ বছরে একজনকেও ফেরানো যায়নি।

রোহিঙ্গাদের ফেরা নিয়ে অনেকে অনেক কথা বললেও আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের দিক থেকে কোনো সমন্বিত সক্রিয় ও শক্তিশালী পদক্ষেপ ছিল না বলে মনে করেন, যাঁরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় কাজ করেন তাঁরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এখনো কেউ যায়নি, এটা ঠিক। তবে আমরা চেষ্টা ছাড়িনি। মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। পরিবেশ তৈরি করে নিজেদের নাগরিকদের ফেরানোর দায়িত্ব মূলত তাদের। অবশ্য পাঁচ বছরে কেউ ফিরতে পারেনি, এতে তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।’

কক্সবাজার ও নোয়াখালীর ভাসানচরে সব মিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয়ে আছে। ক্যাম্পগুলোয় প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করায় রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানান সরকারি কর্মকর্তারা।

‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পুনরেকত্রীকরণ এখন সুদূরপরাহত বিষয়’ উল্লেখ করে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের পরিচালক ফারাহ্ কবির বলেন, রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসন ও পুনরেকত্রীকরণের জন্য জাতীয় ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের কোনো সক্রিয় ও শক্তিশালী পদক্ষেপও ছিল না।

গতকাল বুধবার ঢাকায় বাংলাদেশে সর্বশেষ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পাঁচ বছর উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে ফারাহ্ কবির এ কথা বলেন।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারপারসন ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের নির্বাহী পরিচালক মনজুর হাসান বলেন, কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বিচারালয়গুলোয় কিছু বড় সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের ঘটনার ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। জাতিসংঘ এবং আসিয়ানের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হতে পারত বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ তাঁর অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলো। কিন্তু তাদের ভাগ্যের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। এতে তারা অধৈর্য হয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গাদের প্রতিশ্রুতিশীল ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোকপাত করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন।

সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশ-এর পরিচালক অনো ভ্যান ম্যানেন বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের সুরক্ষা আবশ্যক। আর তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য কর্তৃপক্ষকে চাপ দেওয়া চালিয়ে যেতে হবে, যতই সময় লাগুক না কেন।

রোহিঙ্গাদের শুধু ফেরা থেমে আছে, তা নয়, তাদের জন্য প্রতিশ্রুত মানবিক সহায়তায় ঘাটতি দেখা দেওয়াও নিয়মিত হয়ে গেছে গত পাঁচ বছরে। সর্বশেষ ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো প্রতিশ্রুত আর্থিক সাহায্যের মাত্র অর্ধেক জোগান দিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা।

ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি জোহানেস ভ্যান ডের ক্লাউ অবশ্য বলেছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আশা বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনোভাবেই রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক নেতাদের অগ্রাধিকারের অ্যাজেন্ডা থেকে সরানো যাবে না।

মিয়ানমার সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন লন্ডনভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক মিং ইউ হা।

দেশে দেশে সরকারগুলোকে রোহিঙ্গাদের ওপর নিবর্তনের বিচার নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে বলে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া উইংয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন।

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments