সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ সংগ্রহ ও পাচারের নিরাপদ হাতিয়ার “জোত পারমিট” বাণিজ্য!

কক্সবাজার  উত্তর বনবিভাগের নিয়ন্ত্রক ডিপ্লোমা ফরেস্টার আতা ইলাহী!

..ধারাবাহিক  প্রতিবেদন-২

স্টাফ করেসপনডেন্ট, নিউজ কক্সবাজার ।।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ কার্যত শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডিপ্লোমা ফরেস্টার) একেএম আতা এলাহীর হাতেই জিম্মি রয়েছে। উত্তর বন বিভাগের বিশেষ টহল দলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) পাশাপাশি শহর রেঞ্জ কর্মকর্তার মতো দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব রয়েছে একেএম আতা এলাহীর উপর।
অপরদিকে অফিসের দাপ্তরিক কাজ এবং হিসাব খাতও রয়েছে তার নিয়ন্ত্রনে। তার নেতৃত্বে ডিপ্লোমা ফরেস্টারেরা শক্তিশালী সিন্ডিকেট করে বছরের পর বছর জিম্মি করে রেখেছে উত্তর বন বিভাগ।
জানা গেছে, গত বছর শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা ইমদাদুল হক অন্যত্র বদলী হওয়ার পর মোটা অংকের টাকা বিনিয়োগ করে বাঘখালী রেঞ্জ থেকে শহর রেঞ্জে পোস্টিং নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আসলে তাও ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। এমনকি তার ক্ষমতার দম্ভে বন অধিদপ্তরের অনেক সিনিয়র কর্মকর্তাদেরও তিনি পাত্তা দেন না।
শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা আতা এলাহীর দখলে রয়েছে
বনজদ্রব্য, আসবাবপত্র চলাচল পাশ (টিপি), করাতকল (স’মিল) ফার্নিচার মার্ট ও দোকানের লাইসেম্স প্রদান। এখাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। অবৈধ করাতকল, ফার্নিচার দোকান থেকে তালিকা করে মাসিক কয়েক লাখ টাকা চাঁদা উত্তোলণের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।
গত ২০১৯ সালে একই পদে দায়িত্ব পালনকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা হাসান মেহেদী অর্ধ কোটি টাকা লুটপাট করার অভিযোগে বরখাস্ত হন। তার দেখানো পথেই হাটছেন আতা এলাহী, অভিযোগ অনেক বনকর্মীর।
সুত্র মতে, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তহিদুল ইসলামের আস্থাভাজন হওয়ার সুযোগে গত কয়েক মাসে পাহাড় কাটা, বনের জমির দখল বিক্রি, গাছ বিক্রি, গাছ ও ফার্নিচার পাচারে সহযোগীতা, পাহাড়ের মাটি ও গাছ পাচারের গাড়ি জব্দ করে টাকা আদায়, মোটা অঙ্কের জরিমানা আদায় করে নামেমাত্র জরিমানা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে সিংহভাগ টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া চালান তৈরী, রাজস্ব ও বিভিন্ন প্রকল্পের হিসাবে বিভিন্ন জালিয়াতিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে এই আতা এলাহী সিন্ডিকেট।
অভিযোগে আরো প্রকাশ, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের আওতাধীন কক্সবাজার শহর রেঞ্জ। অতিলোভনীয় ও অবৈধ আয়ের উৎস ভুমি খ্যাত এই শহর রেঞ্জেই টিপি, জোত পারমিট, পিওআর,সিওআর মামলা নিষ্পত্তিসহ রাজস্ব আয় সংক্রান্ত দাপ্তরিক কাজগুলো সম্পাদন হয়ে আসছে। এছাড়াও বনজ দ্রব্য পাচার রোধে গঠিত বন বিভাগের বিশেষ টহল দলের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এর দায়িত্বও একই কর্মকর্তা পালন করায় সীমাহীন দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে অফিসটি। বিভাগীয় বন কর্মকর্তার আস্থাভাজন ও অবৈধ আয় বর্ধনে বিশেষ ভুমিকা রাখায় ওই শহর রেঞ্জ কর্মকর্তার কদরও আলাদাভাবে বেশী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বনকর্মী জানিয়েছেন ডিএফওর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করা ওই রেঞ্জ কর্মকর্তাকে অন্যান্য বনকর্মীরা একটু খাতির যত্নও বেশি করতে হচ্ছে। তাকে খুশি করা না গেলে কৌশলে ফাঁদে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন রকম অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্যসহ রাজস্ব আয়ের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এই রেঞ্জের দায়িত্ব পালনকারী ডিপ্লোমা ফরেস্টার হাসান মেহেদী সহ বেশ কয়েকজন বদলী ও চাকুরীচ্যুত হয়েছেন। বর্তমান শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম আতা এলাহী বাঁকখালী রেঞ্জের সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করে সরকারী কোটি কোটি টাকার গাছ পাচারে সহযোগীতা করেছে। তাৎকালিক শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা ইমদাদুল হক বদলী হওয়ায় সেই পদে স্থলাভিষিক্ত হন বাঁকখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম আতা এলাহী। অবশ্য বনকর্মীদের দাবী পোস্টিং বাণিজ্যের কারণে ভাল স্টেশনগুলো ঘুরে ফিরে বন সিন্ডিকেটের কর্মকর্তারাই ভাগিয়ে নেন। আতা এলাহীর বেলায়ও তা বিপরীত ঘটেনি।
অভিযোগে আরো প্রকাশ,
কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কাঠ সংগ্রহ ও পাচার করার ক্ষেত্রে জোত পারমিটকে অবৈধ ভাবে ব্যবহার করা হয়। এ কাজে বিশেষ ভুমিকা রাখছে শহর রেঞ্জ কর্মকর্তার একেএম আতা এলাহী।
বিশেষ করে চোরাই কাঠ পাচারের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে একটা বৈধতার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয় ভুয়া জোত পারমিটের কাগজ তৈরি করে। জোত পারমিটের আড়ালে সংরক্ষিত বনের কাঠ চুরি করা হয়। তেমনি ভাবে চোরাই কাঠ জেলার বাইরে চট্টগ্রাম, ঢাকা পাচারের জন্য ট্রানজিট পাশ (টিপি) ব্যবহার করা হয়। তবে কোনো ধরনের কাগজপত্র ছাড়াই কাঠ পাচারের ঘটনাও ব্যতিক্রম নয়।
এদিকে, নাইক্ষ্যংছড়ি, বাইশারী এলাকার অবৈধ কাঠকে জোত পারমিটের আড়ালে বৈধ রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে স্থানীয় জোতের মালিকের কাছ থেকে জমির দলিল ও ছবি নিয়ে জোত পারমিটের জন্য আবেদন করা হয়। অবৈধ অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট জোতের দলিল সংশ্লিষ্ট এলাকার কারবারী ও হেডম্যান কর্তৃক সত্যায়িত করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ডিসি অফিস ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট জোতে যেয়ে দলিল ও অন্যান্য শর্তাবলী পূরণ সাপেক্ষে জোত পারমিট ইস্যু করার কথা থাকলেও সাধারণত তা করা হয় না। ডিসি অফিসে এবং বন বিভাগের সংশি−ষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দেওয়ার মাধ্যমে কোনো তদন্ত ছাড়াই জোত পারমিট ইস্যু করিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া বনবিভাগ থেকে নিলামে নেওয়া কাঠের টিপি ইস্যু, চেকিং করার নামেও টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে আতা এলাহীর বিরুদ্ধে।
ভুয়া এসব জোত পারমিট ও বৈধ টিপির নামে দেদারছে পাচার হচ্ছে কক্সবাজার বনাঞ্চলের মুল্যবান কাঠ। রাতের আধাঁরে কাঠ পাচারে সহযোগীতা দিয়ে যাচ্ছে বনবিভাগের বিশেষ টহল দলের ওসির দায়িত্ব নেওয়া আতা এলাহী। তবে লেনদেনের হেরফের হলেই কাঠ ভর্তি ট্রাক, মিনি ট্রাক আটকের ঘটনা ঘটে। এরপর মামলার হুমকি দিয়ে আূায় করা হয় মোটা অংকের অর্থ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কাঠ ব্যবসায়ী এই অভিযোগ করেন।
এব্যাপারে কক্সবাজার শহর রেঞ্জ কর্মকর্তার ও বিশেষ টহল দলের ওসির একেএম আতা এলাহী বলেন,তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগগুলো সত্য নয়। ডিএফও আমাকে ভাল মনে করেছে বলে দুটি স্থানে দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন।
উল্লেখিত অভিযোগের ব্যাপারে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বলেন কোন প্রমাণ থাকলে আমাকে দিন। এরপর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

(আগামী পর্বে  থাকছে…
“অবৈধ স’মিল ও ফার্ণিচার দোকানে আতা এলাহীর মাসে কয়েক লাখ টাকা চাঁদাবাজি। “)

 

 

আপনার মন্তব্য দিন