বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৪:২৫ পূর্বাহ্ন

স্বপ্নবান মানুষ কোথায়?

নিউজ কক্সবাজার ডটকম
  • আপডেট টাইম শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০

তসলিমা নাসরিন।।

পৃথিবীর সবচেয়ে স্বপ্নবান মানুষটির নাম এলন মাস্ক। তিনি ২০৫০ সালের মধ্যে মঙ্গলগ্রহে একটি নগরী বানিয়ে ফেলতে চাইছেন, যে নগরীতে বাস করবে ১০ লাখ মানুষ। চার বছর পর মঙ্গলগ্রহে প্রথম দুটো নভোচারীচালিত মহাকাশযানে ১০০ জন মানুষ পাঠাবেন। আর দুটো মহাকাশযানকে ব্যবহার করবেন কার্গো হিসেবে। ওসবে বাড়িঘর, গ্রিনহাউজ, মহাকাশযান বন্দর ইত্যাদি নির্মাণের জন্য মালপত্র পাঠাবেন। এরপর থেকে দুটো গ্রহ- পৃথিবী আর মঙ্গল- যার যার অক্ষে ঘুরতে ঘুরতে যখন ২৬ মাসে একে অপরের সবচেয়ে কাছে চলে আসবে, তখনই আমাদের মহাকাশযান পৌঁছবে মঙ্গলে। ৫ মাস লাগবে পৌঁছতে। মঙ্গল গ্রহে যে নগরীটি বানাবেন এলন মাস্ক, সেটির একটি নকশাও এঁকে ফেলেছেন।

মঙ্গল যাত্রীদের মাথাপিছু যাওয়া আসার টিকিট খরচ ৫ লাখ ডলার। কিন্তু এলন বলছেন, সব টাকা দেওয়ার দরকার নেই, যাদের টাকা নেই তারা ধার নিক টাকা, তারপর মঙ্গলে চাকরি করে টাকা শোধ করে দেবে। নগরী গড়ে উঠবে, চাকরির অভাব হবে না। ১০০ বিলিয়ন থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হবে নগরীটি নির্মাণ করতে। এলন মাস্কের স্বপ্নের কথা শুনে বেশ উত্তেজিত হই বটে, কিন্তু আমার মনে হয় না আর তিরিশ বছরের মধ্যে মঙ্গল গ্রহের নগরীতে ১০ লাখ মানুষের বসবাস শুরু করা সম্ভব। যদিও যুক্তি বুদ্ধি বিজ্ঞান খাটিয়ে নানা পরীক্ষা করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, সম্ভব। কিন্তু তারপরও মনে হয় সবই বোধহয় কল্পবিজ্ঞান। কোনও কোনও বিজ্ঞানী বলছেন, মঙ্গল গ্রহে মহাজাগতিক রশ্মির কারণে মানুষ বাস করতে পারবে না। যদি বাস করতেই হয়, মাটির তলায় বাস করতে হবে। মঙ্গলের চেয়ে বাসযোগ্য টাইটান, শনি গ্রহের উপগ্রহ। ওতে মহাজাগতিক বা কসমিক রশ্মির উপদ্রব নেই। জল নেই, অক্সিজেন নেই, কিন্তু যথেষ্ট এইচ টু-ও আছে, যেগুলো থেকে অক্সিজেন বানানো যাবে।

মানুষ প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে আজ না হোক কাল আমাদের পাড়ি দিতে হবে অন্য গ্রহে। এ ছাড়া উপায় নেই। সবচেয়ে ভালো হতো আমরা যদি এই সৌরজগতের বাইরে অন্য সৌরজগতে বসবাসের যোগ্য কোনও গ্রহ পেতাম। অতদূর পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের আপাতত নেই। আপাতত এই পৃথিবী ত্যাগ করে কাছাকাছি কোনও গ্রহে আশ্রয় নেওয়ার চিন্তাভাবনা আমাদের করতে হবে। আমাদের মস্তিষ্কে যতটুকু কুলোয় তার বেশি তো আর আমরা যেতে পারব না। মানুষের মস্তিষ্ক কয়েকশ’ বা কয়েক হাজার বছর পর বিবর্তনের ফলে যদি আরও উন্নত হতে পারে, তাহলে আমরা যা পারিনি, হয়তো তারা পারবে। ৭.৫ বিলিয়ন বছর পর এই সৌরগতের সূর্য মরে যাবে, শুষে নেবে পৃথিবীসহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহকে। সে না হয় অতি দূর ভবিষ্যতের কথা। তার আগেই তো নানা রকম দুর্যোগ এসে পৃথিবী ধংস করে দিতে পারে। পৃথিবীময় পারমাণবিক বিস্ফোরণ যদি ঘটে, জীবননাশকারী অপ্রতিরোধ্য জীবাণু যদি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, আগ্নেয়গিরির লাভায় যদি পৃথিবী ঢেকে যায়, যদি কোনও উল্কাপতনের পর সূর্যের আলো ঢেকে যায়, যদি মরে যায় সব উদ্ভিদ, যদি শুকিয়ে যায় জল… তা ছাড়াও কোনও এক সময় আমাদের নানা কাজে সুবিধের জন্য আমাদেরই তৈরি করা অতি বুদ্ধিমান রোবট যদি মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে পৃথিবী দখল করে নেয়! কোনও আশংকাই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

অনেকে এলন মাস্ককে নিয়ে হাসাহাসি করে। বলে, এলন উদ্ভট এবং অসম্ভব সব চিন্তার লোক। নাসা কিন্তু তাঁকে হেলা করছে না, বরং তাঁর এক্সপেরিমেন্টগুলোয় সাহায্য করছে। একসময় রেডিও, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, মোটরগাড়ি, উড়োজাহাজ, মহাকাশযান বা ঘরে ঘরে কম্পিউটার, হাতে হাতে ফোন- নিতান্তই কল্পবিজ্ঞান ছিল, আজ এগুলো বাস্তবতা। যদি মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় এই সৌরজগতে বা অন্য সৌরজগতের কোনও বাসযোগ্য গ্রহে পাড়ি দেওয়া, সেটি তো অবশ্যই চমৎকার। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত আমাদের এই পৃথিবীকে কি বাসযোগ্য করা উচিত নয় আমাদের? আর অপ্রিয় সত্যিটা হলো, যদি বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান মেলে, তাহলে শুধু ধনীরাই নতুন গ্রহে বাস করতে যাবে, গরিব এই পৃথিবীতেই পড়ে থাকবে।

আমরা ইতিমধ্যেই জানি, মানুষ খুব শান্তিপ্রিয় প্রাণী নয়, এবং মানুষ সবাই একই মানসিকতার নয়। কেউ উদার, কেউ নিষ্ঠুর। কেউ সৎ, কেউ অসৎ। কেউ বোকা, কেউ চতুর। বৃহত্তর স্বার্থে এদের এক করা যায়, কিন্তু বৃহত্তম স্বার্থে এদের এক করা কঠিন। সে কারণেই হয়তো সমাজতন্ত্র দেশে দেশে অসফল।

কিন্তু তারপরও যতদিন এই পৃথিবীতে আছি, ততদিন এই পৃথিবীকেই না হয় বাসযোগ্য করি। মঙ্গল গ্রহকে বাসযোগ্য করার জন্য এলন মাস্ক আছেন। এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার জন্য প্রচুর স্বপ্নবান এলন মাস্কের প্রয়োজন। এখানে যেন মানুষ আর অনাহারে অপুষ্টিতে না ভোগে। মানুষ যেন বৈষম্যের শিকার না হয়। মেয়েরা যেন মানুষের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। তাদের যেন কেবলই যৌনবস্তু হিসেবে দেখা না হয়। তাদের যেন মেয়ে হওয়ার কারণে নির্যাতিত না হতে হয়। পৃথিবী থেকে যেন ধর্ম, বর্ণ, জাত এবং জাতীয়তাভিত্তিক বৈষম্য চিরকালের জন্য বিলুপ্ত হয়। মানুষ যেন খেয়ে পরে আনন্দ উল্লাসে সুখে স্বস্তিতে নিশ্চিন্তে নিরাপত্তায় বেঁচে থাকতে পারে। মানুষ যদি এটুকুই না পারে, তাহলে এই প্রজাতিকে দূরের গ্রহে নিয়ে গিয়ে বাঁচিয়ে রাখার কী দরকার। মঙ্গল গ্রহে গিয়েও কি পুরুষেরা যৌন নির্যাতন করবে মেয়েদের, ওখানেও কি মেয়েদের পুরুষের চেয়ে কম বুদ্ধিমান, কম দক্ষ, কিছুটা কম-মানুষ হিসেবে বিচার করা হবে? ওখানেও কি শিশুদের ধর্ষণ করা হবে? ওখানেও কি গরিব আর ধনী থাকবে, শ্রেণি বৈষম্য থাকবে? ওখানেও কি গরিবকে শোষণ করবে ধনীরা? সমাজকে যদি বৈষম্যহীন করে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে কী দরকার গ্রহান্তর! হয়তো এই প্রজাতি বেঁচে থাকলে আরও বেশি ধংসাত্মক কাজে লিপ্ত হবে। অন্য গ্রহে গিয়েও একের বিরুদ্ধে আরেক হিংসেহিংসির যুদ্ধ বাধাবে, পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে। হয়তো ওই গ্রহকেও বাসের অযোগ্য বানাবে, কত আর নতুন গ্রহ খুঁজতে হবে এই দুর্ভাগা মানুষ প্রজাতিটির জন্য!

কেউ কেউ বলতে পারে মানুষের রক্তে সুখে শান্তিতে সবাইকে নিয়ে বসবাস নেই। তাহলে কি তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই? নিশ্চয়ই আছে। বুদ্ধি খাটিয়ে গ্রহ আবিষ্কার করছে, বংশপরম্পরায় বেঁচে থাকবে! বৈষম্যবিহীন সমাজ কেন তাদের গড়তেই হবে? প্রতিযোগিতায় যে এগিয়ে যেতে পারবে, সে বেশি পাবে, যে পারবে না, সে কম পাবে। এরকমই নিয়ম হওয়া উচিত। এই নিয়ম চলতে থাকলে মানুষের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াই ভালো- এমন মন্তব্য নিতান্তই অসহিষ্ণু মন্তব্য। হয়তো ধীরে ধীরে কোনও একদিন বৈষম্য ঘুচবে, হয়তো ঘুচবে না। কিছু প্রাণীর মধ্যে বৈষম্য আছে, কিছু প্রাণীর মধ্যে নেই। যার যার বৈশিষ্ট্য নিয়ে সে সে বেঁচে থাকে। মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী, মানুষ স্বভাব চরিত্রকে বদলাতে পারে বলেই হয়তো মানুষের কাছে দাবি আমাদের বেশি। সিংহকে যদি বলি হারেম বন্ধ করো, একগামী সম্পর্ক রাখো। সিংহ শুনবে না। কিন্তু মানুষ শুনেছে, মানুষ বদলেছে স্বভাব চরিত্র। যদি একবার বদলাতে পারে, তাহলে বারবার পারবে বদলাতে। সে কারণে মানুষ নিয়ে অনেকের, এমন কী আমারও, আবেগ উচ্ছ্বাসটা বেশি। স্বপ্নটা বেশি।

মানুষের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার আর প্রচলিত বৈষম্য মানার সংখ্যা প্রচুর, কিন্তু স্বপ্ন দেখার মানুষের অভাব প্রচন্ড। শুধু নিজের আরাম আয়েশের কথা ভাবা, শুধু ৫০ বা ১০০ বছর পর্যন্ত ভাবার লোক পাওয়া যায়, কিন্তু অন্যের কথা, সমষ্টির কথা, প্রজাতির কথা ভাবা, ১০০০ বছর বা ১০,০০০ বছর বা ১ লাখ বছর পর্যন্ত ভাবার লোক পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় না বলে আমরা মেয়েদের নির্যাতন করি, আমরা দরিদ্র তৈরি করি, আমরা আবহাওয়া নষ্ট করি।

লেখক : তসলিমা নাসরিন।

নির্বাসিত লেখিকা।

আপনার মন্তব্য দিন

নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো সংবাদ>>
© All rights reserved © 2017-2020 নিউজ কক্সবাজার ডটকম
Theme Customized By Shah Mohammad Robel