লিবিয়ায় চরম আতঙ্কে বাংলাদেশি শ্রমিকরা : পরিচয় মিলেছে হতাহতদের

ডেস্ক রিপোর্ট :  

লিবিয়ায় মানব পাচারকারী চক্রের গুলিতে ২৬ বাংলাদেশি নিহত হওয়ায় ঘটনায় চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে। কেউ কেউ আতঙ্কে  বাইরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।

লিবিয়ার বানি ওয়ালিদ শহর থেকে একাধিক শ্রমিক জানিয়েছেন, নিহতদের অনেকেই মাদারীপুর জেলার বাসিন্দা বলে শোনা যাচ্ছে।

লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের এক সদস্যের সহযোগী ও স্বজনদের বর্বরোচিত আক্রমণে হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় মিলেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ওই ঘটনায় ২৬ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১১ জন।

হতাহতদের মধ্যে ‘নিখোঁজ বা মৃত’ হিসেবে ২৪ জনের এবং আহত হিসেবে ১১ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে।

নিখোঁজ বা মৃত’ ২৪ জন হলেন- গোপালগঞ্জের সুজন ও কামরুল; মাদারীপুরের জাকির হোসেন, সৈয়দুল, জুয়েল ও ফিরুজ, রাজৈরের বিদ্যানন্দীর জুয়েল ও মানিক, টেকেরহাটের আসাদুল, আয়নাল মোল্লা (মৃত) ও মনির, ইশবপুরের সজীব ও শাহীন, দুধখালীর শামীম; ঢাকার আরফান (মৃত); টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের লাল চান্দ; কিশোরগঞ্জের ভৈরবের রাজন, শাকিল, সাকিব ও সোহাগ, রসুলপুরের আকাশ ও মো. আলী, হোসেনপুরের রহিম (মৃত) এবং যশোরের রাকিবুল।

আহত ১১ জন হলেন- মাদারীপুর সদরের তীর বাগদি গ্রামের ফিরোজ বেপারী (হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ), ফরিদপুরের ভাঙ্গার দুলকান্দি গ্রামের মো. সাজিদ (পেটে গুলিবিদ্ধ), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শম্ভপুর গ্রামের মো. জানু মিয়া (পেটে গুলিবিদ্ধ), ভৈরবের জগন্নাথপুর গ্রামের মো. সজল মিয়া (দুই হাতে মারাত্মকভাবে জখম ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন), গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বামনডাঙ্গা বাড়ির ওমর শেখ (হাতে মারাত্মকভাবে জখম ও আঙ্গুলে কামড়ের দাগ, দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ), টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের মো. তরিকুল ইসলাম (২২), চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার বেলগাছির খেজুরতলার মো. বকুল হোসাইন (৩০), মাদারীপুরের রাজৈরের কদমবাড়ির মো. আলী (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সখিপুরের মওটুলীর সোহাগ আহমেদ (২০), মাদারীপুরের রাজৈরের ইশবপুরের মো. সম্রাট খালাসী (২৯) এবং চুয়াডাঙ্গার বাপ্পী (মস্তিষ্কে গুলিবিদ্ধ, গুরুতর অবস্থা)। এরা সবাই ত্রিপোলি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

লিবিয়ার বেনওয়ালিদ শহরের একটি সিরামিক কম্পানিতে চাকরি করেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার আমগাছী গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম।

তিনি ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে জানান, তাঁরা  যে শহরে কাজ করেন, সেখান থেকে ঘটনাস্থল মিজদাহ শহর প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে।

সম্ভবত যাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের বেনওয়ালিদ শহর হয়ে ত্রিপলিতে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ত্রিপলিতে যাওয়ার আগেই মিজদাহ শহরে এলোপাতাড়ি গুলি করে তাঁদের হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার পর থেকে বাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই কাজ শেষে বাসায় চলে যাচ্ছেন। ভয়ে রাস্তাঘাটে বের হচ্ছেন না।’

রফিকুল বলেন, ‘যত দূর জানতে পেরেছি, নিহতরা অনেকেই মাদারীপুর জেলার বাসিন্দা। কিন্তু কারো নাম-ঠিকানা সঠিকভাবে পাওয়া যায়নি। লিবিয়ায় অবস্থানরত বাঙালিরা জানার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কেউই ঘরের বাইরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না।’

নওগাঁর জয়নাল হোসেন ও উজ্জল হোসেনও একই তথ্য দেন।

তাঁরা জানান, বাঙালি শ্রমিকরা খুবই আতঙ্কে আছেন। নিহতদের বেশির ভাগই মাদারীপুরের বাসিন্দা বলে শোনা যাচ্ছে।

বগুড়ার মাসুম হোসেন বলেন, ‘বানি ওয়ালিদ শহরে আমরা প্রায় ১০০ বাঙালি শ্রমিক কাজ করি। ওই ঘটনার পর থেকে আমরা চরম আতঙ্কে আছি।

আমার জানা মতে একসঙ্গে এত বাঙালি কখনো লিবিয়াতে মারা যায়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘লিবিয়ায় সাধারণত বাঙালিদের শ্রমিক হিসেবেই আনা হয়। তার পরও অনেকে অনেক পেশায় জড়িত আছেন।

লিবিয়ার সংবাদমাধ্যম জানায়, বৃহস্পতিবার ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসী শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করে মানবপাচারকারী চক্রের এক সদস্যের সহযোগী ও স্বজনরা। নিহত বাকি চারজন আফ্রিকান। আহত হয়েছেন আরও ১১ বাংলাদেশি। ওই বাংলাদেশিসহ অভিবাসীদের মিজদা শহরের একটি জায়গায় টাকার জন্য জিম্মি করে রাখে মানবপাচারকারী চক্র। এ নিয়ে এক পর্যায়ে ওই চক্রের সঙ্গে মারামারি হয় অভিবাসী শ্রমিকদের। এতে এক মানবপাচারকারী মারা যায়। তারই প্রতিশোধ হিসেবে সেই মানবপাচারকারীর পরিবারের লোকজন এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, লিবিয়ার মিজদা শহরের এক নাগরিক অবৈধ অভিবাসীদের উপকূলীয় শহরে পাচারকালে তাদের হাতে নিহত হন। এতে ওই ব্যক্তির স্বজনেরা আইন নিজেদের হাতে তুলে নেন এবং বাংলাদেশের ২৬ জন ও আফ্রিকার চারজনকে হত্যা করা হয়।

আপনার মন্তব্য দিন